১০:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
বিশ্ব অর্থনীতির নতুন বিপদ: বাণিজ্য নয়, ভারসাম্যহীনতার গভীর সংকট ডেঙ্গুতে আরও ৩ মৃত্যু, চলতি বছরে প্রাণহানি ৫০; হাসপাতালে ভর্তি ১৪,৬৯০ আসামে বন্যায় মৃত বেড়ে ৭৫, ক্ষতিগ্রস্ত ১১ লাখের বেশি মানুষ একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা এখন জরুরি প্রয়োজনে তুলতে পারবেন ১০ লাখ টাকা নেপালে বাঘের সংখ্যা বেড়ে ৪২৯, ২০১০ সালের তুলনায় প্রায় চার গুণ কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ: মিরাজ শেখকে উদ্ধারে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাইল আসক ক্ষমতার অসুখ: নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় বিপদ অহংকার নয়, জবাবদিহির অভাব ফরচুন গ্লোবাল ৫০০: আয় ধরে রাখলেও মুনাফায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক পিছিয়ে চীনা কোম্পানিগুলো চীনের নতুন রহস্যময় পারমাণবিক সাবমেরিন ঘিরে উদ্বেগ, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তি বাড়ানোর ইঙ্গিত বাংলাদেশে হামের মৃত্যু বেড়ে ৮৩১, ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ শিশুর প্রাণহানি

মালয়ালম সিনেমার আলাদা পথচলা, সমাজ বদলের ইতিহাসেই লুকিয়ে তার শক্তি

ভারতের আঞ্চলিক চলচ্চিত্র জগতে মালয়ালম সিনেমা বরাবরই একটু ভিন্ন ধারার পরিচয় দিয়েছে। বড় বাজেট, অতিনাটকীয়তা কিংবা কেবল বাণিজ্যিক সাফল্যের দৌড়ে না গিয়ে এই শিল্প বরং মানুষের বাস্তব জীবন, সমাজের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক চেতনার গল্প তুলে ধরেছে। কেরালার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে এই চলচ্চিত্র ধারার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মালয়ালম সিনেমা আবারও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে। বাস্তবধর্মী গল্প, শক্তিশালী চিত্রনাট্য এবং মানবিক চরিত্র নির্মাণের কারণে এই শিল্পকে ভারতের অন্য চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি থেকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে।

সামাজিক পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস

একসময় কেরালায় বর্ণ বৈষম্য ও সামাজিক অসাম্য ছিল চরম পর্যায়ে। নিম্নবর্ণের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারী স্বাধীনতা এবং সামাজিক সংস্কারের জন্য দীর্ঘ আন্দোলন হয়েছে সেখানে। সমাজ সংস্কারক শ্রী নারায়ণ গুরু, আয়্যাঙ্কালি ও আরও অনেক নেতার আন্দোলন কেরালার সমাজকে বদলে দেয়। মন্দিরে প্রবেশাধিকার থেকে শুরু করে শিক্ষার সুযোগ—সব ক্ষেত্রেই ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে।

এই সামাজিক আন্দোলনের প্রভাব পরে মালয়ালম সিনেমাতেও পড়ে। অন্য অনেক ভাষার ছবিতে যখন পৌরাণিক কাহিনি বেশি প্রাধান্য পাচ্ছিল, তখন মালয়ালম সিনেমায় পরিবার, সমাজ ও মানুষের বাস্তব সংকটকে কেন্দ্র করে গল্প তৈরি হচ্ছিল।

শুরু থেকেই বাস্তবধর্মী গল্প

১৯৩০ সালে জে.সি. ড্যানিয়েলের ‘ভিগাথাকুমারন’ দিয়ে মালয়ালম সিনেমার যাত্রা শুরু হয়। সেই সময়ে সিনেমা নির্মাণ ছিল খুবই কঠিন কাজ। অনেক নির্মাতা নিজের সব সঞ্চয় খরচ করে ছবি বানাতেন। নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্রও তৈরি হতো না। তবে ধীরে ধীরে স্থানীয় স্টুডিও গড়ে ওঠার পর শিল্পটি নতুন গতি পায়।

Breaking up with the Malayalam film industry: When the stars you love turn  to dust

এরই মধ্যে কেরালায় বামপন্থী রাজনীতির উত্থান শুরু হয়। কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও আসে বড় পরিবর্তন। নাটক, সাহিত্য এবং সিনেমায় সাধারণ মানুষের সংগ্রাম ও রাজনৈতিক চেতনা গুরুত্ব পেতে থাকে। এই সময়ের নাটক ও চলচ্চিত্র জনমতের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।

ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের প্রভাব

ষাটের দশকে কেরালায় ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন নতুন এক সাংস্কৃতিক জাগরণ তৈরি করে। অদূর গোপালকৃষ্ণন ও তাঁর সহযাত্রীরা বিশ্ব সিনেমার সঙ্গে কেরালার দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেন। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত নানা জায়গায় বিশ্বমানের চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হতে থাকে। এতে নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা সিনেমাকে ভিন্নভাবে দেখতে শেখেন।

এর ফলেই মালয়ালম সিনেমায় নতুন ধারার জন্ম হয়। বাস্তববাদী গল্প, মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং সমাজের গভীর সংকট উঠে আসে চলচ্চিত্রে। অদূরের ‘স্বয়ম্বরম’, জন আব্রাহামের কাজ কিংবা জি. অরবিন্দনের সিনেমা এই পরিবর্তনের বড় উদাহরণ হয়ে ওঠে। পরে কে.জি. জর্জ, পদ্মরাজন ও ভরতনের মতো নির্মাতারা জনপ্রিয়তা ও শিল্পমানের সমন্বয় ঘটিয়ে এক নতুন ধারা তৈরি করেন।

আজকের নতুন ঢেউ

বর্তমান সময়ে মালয়ালম সিনেমার যে নতুন ঢেউ দেখা যাচ্ছে, তার শিকড় আসলে আশির দশকের সেই মধ্যধারার সিনেমায়। আজকের অনেক নির্মাতা ছোটবেলায় সেই ছবিগুলো দেখেই বড় হয়েছেন। ফলে পুরোনো বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্রের প্রভাব এখনকার সিনেমাতেও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

সাম্প্রতিক সময়ের অনেক আলোচিত মালয়ালম ছবি আন্তর্জাতিক দর্শকেরও প্রশংসা পেয়েছে। মানবিক সংকট, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং সমাজের অন্ধকার দিকগুলোকে যেভাবে এই চলচ্চিত্রগুলো তুলে ধরে, তা বিশ্ব সিনেমার সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করার মতো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্ব অর্থনীতির নতুন বিপদ: বাণিজ্য নয়, ভারসাম্যহীনতার গভীর সংকট

মালয়ালম সিনেমার আলাদা পথচলা, সমাজ বদলের ইতিহাসেই লুকিয়ে তার শক্তি

০৯:০০:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬

ভারতের আঞ্চলিক চলচ্চিত্র জগতে মালয়ালম সিনেমা বরাবরই একটু ভিন্ন ধারার পরিচয় দিয়েছে। বড় বাজেট, অতিনাটকীয়তা কিংবা কেবল বাণিজ্যিক সাফল্যের দৌড়ে না গিয়ে এই শিল্প বরং মানুষের বাস্তব জীবন, সমাজের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক চেতনার গল্প তুলে ধরেছে। কেরালার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে এই চলচ্চিত্র ধারার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মালয়ালম সিনেমা আবারও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে। বাস্তবধর্মী গল্প, শক্তিশালী চিত্রনাট্য এবং মানবিক চরিত্র নির্মাণের কারণে এই শিল্পকে ভারতের অন্য চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি থেকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে।

সামাজিক পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস

একসময় কেরালায় বর্ণ বৈষম্য ও সামাজিক অসাম্য ছিল চরম পর্যায়ে। নিম্নবর্ণের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারী স্বাধীনতা এবং সামাজিক সংস্কারের জন্য দীর্ঘ আন্দোলন হয়েছে সেখানে। সমাজ সংস্কারক শ্রী নারায়ণ গুরু, আয়্যাঙ্কালি ও আরও অনেক নেতার আন্দোলন কেরালার সমাজকে বদলে দেয়। মন্দিরে প্রবেশাধিকার থেকে শুরু করে শিক্ষার সুযোগ—সব ক্ষেত্রেই ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে।

এই সামাজিক আন্দোলনের প্রভাব পরে মালয়ালম সিনেমাতেও পড়ে। অন্য অনেক ভাষার ছবিতে যখন পৌরাণিক কাহিনি বেশি প্রাধান্য পাচ্ছিল, তখন মালয়ালম সিনেমায় পরিবার, সমাজ ও মানুষের বাস্তব সংকটকে কেন্দ্র করে গল্প তৈরি হচ্ছিল।

শুরু থেকেই বাস্তবধর্মী গল্প

১৯৩০ সালে জে.সি. ড্যানিয়েলের ‘ভিগাথাকুমারন’ দিয়ে মালয়ালম সিনেমার যাত্রা শুরু হয়। সেই সময়ে সিনেমা নির্মাণ ছিল খুবই কঠিন কাজ। অনেক নির্মাতা নিজের সব সঞ্চয় খরচ করে ছবি বানাতেন। নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্রও তৈরি হতো না। তবে ধীরে ধীরে স্থানীয় স্টুডিও গড়ে ওঠার পর শিল্পটি নতুন গতি পায়।

Breaking up with the Malayalam film industry: When the stars you love turn  to dust

এরই মধ্যে কেরালায় বামপন্থী রাজনীতির উত্থান শুরু হয়। কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও আসে বড় পরিবর্তন। নাটক, সাহিত্য এবং সিনেমায় সাধারণ মানুষের সংগ্রাম ও রাজনৈতিক চেতনা গুরুত্ব পেতে থাকে। এই সময়ের নাটক ও চলচ্চিত্র জনমতের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।

ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের প্রভাব

ষাটের দশকে কেরালায় ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন নতুন এক সাংস্কৃতিক জাগরণ তৈরি করে। অদূর গোপালকৃষ্ণন ও তাঁর সহযাত্রীরা বিশ্ব সিনেমার সঙ্গে কেরালার দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেন। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত নানা জায়গায় বিশ্বমানের চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হতে থাকে। এতে নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা সিনেমাকে ভিন্নভাবে দেখতে শেখেন।

এর ফলেই মালয়ালম সিনেমায় নতুন ধারার জন্ম হয়। বাস্তববাদী গল্প, মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং সমাজের গভীর সংকট উঠে আসে চলচ্চিত্রে। অদূরের ‘স্বয়ম্বরম’, জন আব্রাহামের কাজ কিংবা জি. অরবিন্দনের সিনেমা এই পরিবর্তনের বড় উদাহরণ হয়ে ওঠে। পরে কে.জি. জর্জ, পদ্মরাজন ও ভরতনের মতো নির্মাতারা জনপ্রিয়তা ও শিল্পমানের সমন্বয় ঘটিয়ে এক নতুন ধারা তৈরি করেন।

আজকের নতুন ঢেউ

বর্তমান সময়ে মালয়ালম সিনেমার যে নতুন ঢেউ দেখা যাচ্ছে, তার শিকড় আসলে আশির দশকের সেই মধ্যধারার সিনেমায়। আজকের অনেক নির্মাতা ছোটবেলায় সেই ছবিগুলো দেখেই বড় হয়েছেন। ফলে পুরোনো বাস্তবধর্মী চলচ্চিত্রের প্রভাব এখনকার সিনেমাতেও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

সাম্প্রতিক সময়ের অনেক আলোচিত মালয়ালম ছবি আন্তর্জাতিক দর্শকেরও প্রশংসা পেয়েছে। মানবিক সংকট, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং সমাজের অন্ধকার দিকগুলোকে যেভাবে এই চলচ্চিত্রগুলো তুলে ধরে, তা বিশ্ব সিনেমার সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করার মতো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।