দেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি দিন দিন আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। চলতি মে মাসের শুরু থেকে শেষভাগ পর্যন্ত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও শুরুতে প্রয়োজনীয় সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে দেরি হওয়ায় পরিস্থিতি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসে আট হাজার ৩৬৭ জন রোগী। সে সময়ে মৃত্যু হয় ৬০ শিশুর। কিন্তু ১৮ থেকে ২৪ মে পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় আট হাজার ৯০১ জনে এবং মৃত্যু হয় ৬৯ শিশুর। অর্থাৎ কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে আক্রান্তের সংখ্যা ৭ শতাংশ এবং মৃত্যু ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
গতকাল রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও ১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এটি এক দিনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। এর আগে এক দিনে ১৭ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। একই সময়ে নতুন আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৪৩৪ জন। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫২৮ জনে।

অঞ্চলভিত্তিক পরিস্থিতি
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ঢাকায় ১০ জন, ময়মনসিংহে দুইজন এবং রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল ও রংপুরে একজন করে রয়েছে। এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে মারা গেছে ৪৪২ শিশু এবং নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মৃত্যু হয়েছে আরও ৮৬ শিশুর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ৬৩ হাজার ৮১৩ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫০ হাজার ৫৫৮ শিশু। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৪৬ হাজার ২১৪ শিশু। একই সময়ে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে আট হাজার ৬২২ জনের শরীরে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু
জাতিসংঘ বাংলাদেশের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০ মে পর্যন্ত দেশের সব ৬৪ জেলায় ৫৭ হাজার ৮৫৬ জন সন্দেহভাজন এবং আট হাজার ৬৭ জন নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের ৮১ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৯ এপ্রিল থেকে প্রতি সপ্তাহেই সংক্রমণ উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রতিদিন গড়ে আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজার ১০০ ছাড়িয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক টিকাদান কর্মসূচির পর কিছু উপজেলায় সংক্রমণ কিছুটা কমার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও বাড়ছে উদ্বেগ
কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেও হামের সংক্রমণ উদ্বেগ তৈরি করেছে। সেখানে ৫৯৫ জন সন্দেহভাজন এবং ৬০ জন নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছে পাঁচজন। আক্রান্তদের ৬৩ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এর মধ্যে ২০ শতাংশ শিশুর বয়স ৯ মাসের নিচে, ফলে তারা নিয়মিত এমআর টিকার আওতায় ছিল না।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেছেন, সরকারের পদক্ষেপ দেরিতে আসায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। তাঁর মতে, উপজেলা পর্যায়ে দ্রুত রোগ শনাক্ত, অক্সিজেন থেরাপি ও কমিউনিটি পর্যায়ে আইসোলেশন নিশ্চিত করা জরুরি। এখনও সরকারিভাবে পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট প্রটোকল প্রকাশ না হওয়ায় চিকিৎসকদের মধ্যে সমন্বিত নির্দেশনার ঘাটতি রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, মারা যাওয়া অনেক শিশুই অপুষ্টিতে ভুগছিল। মায়েদের পুষ্টিহীনতার কারণেও শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন হামের টিকার বয়সসীমা ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস করা হয়েছে। আগে দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদেরও নতুন ক্যাম্পেইনের আওতায় টিকা নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















