রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে শুরু হওয়া মূল্যস্ফীতির চাপ এবার আরও গভীর হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে ঘিরে। কাঁচামাল, শ্রম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জাপানের খাদ্য ও পানীয় শিল্প এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। অনেক প্রতিষ্ঠান সরাসরি দাম বাড়ানোর বদলে পণ্যের আকার ছোট করছে, আবার কেউ কেউ বাধ্য হচ্ছে প্যাকেটের রঙিন নকশা বাদ দিয়ে কালো-সাদা বা স্বচ্ছ মোড়কে যেতে।
জাপানের বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান টেইকোকু ডেটাব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের তুলনায় গত বছরে খাদ্য ও পানীয় পণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি সংখ্যক পণ্যে। মোট ২০ হাজার ৬০৯টি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে কাঁচামালের বাড়তি খরচ।
সংকটে জনপ্রিয় স্ন্যাকস ব্র্যান্ড
জাপানের জনপ্রিয় আলুচিপস প্রস্তুতকারক কোইকে-ইয়া ঘোষণা দিয়েছে, তাদের একটি পণ্যের ওজন ৩০ গ্রাম থেকে কমিয়ে ২৮ গ্রাম করা হবে। একই সঙ্গে কয়েকটি স্ন্যাকস পণ্যের দামও ৩ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। হোক্কাইদো অঞ্চলে অতিরিক্ত গরম ও কম বৃষ্টির কারণে আলুর উৎপাদন কমে যাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
চালের ক্র্যাকার প্রস্তুতকারক কামেদা সেইকাও একই পথে হাঁটছে। প্রতিষ্ঠানটি কিছু পণ্যের দাম ৪ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পাশাপাশি একটি জনপ্রিয় স্ন্যাকসের পরিমাণ ৯০ গ্রাম থেকে কমিয়ে ৭৫ গ্রাম করছে। কোম্পানির ভাষ্য, প্যাকেজিং ও ভোজ্য তেলের ব্যয় বেড়ে যাওয়াই এর কারণ।
একইভাবে স্ন্যাকস জায়ান্ট ক্যালবি তাদের কিছু পণ্যের দাম ৩ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি তিনটি পণ্যের ওজনও কমানো হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তাদের নতুন সিদ্ধান্ত—রঙিন মোড়কের বদলে কালো-সাদা প্যাকেজিং ব্যবহার।
কালো-সাদা মোড়কের নতুন বাস্তবতা
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ন্যাফথার সংকট তৈরি হওয়ায় খাদ্যপণ্যের প্যাকেটে ব্যবহৃত কালি সরবরাহে চাপ পড়েছে। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান রঙিন ডিজাইন বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে।
পাস্তা প্রস্তুতকারক নিশিন সেইফুন ওয়েলনা ইতোমধ্যে তাদের পণ্যের মোড়কে ব্যবহৃত রান্নার সময় উল্লেখ করা রঙিন টেপ বাদ দিয়ে সাদা ফাঁকা টেপ ব্যবহার শুরু করেছে। জাপানের শীর্ষ কেচাপ উৎপাদক কাগোমেও সাদা কালি সরবরাহ অনিশ্চিত হওয়ায় স্বচ্ছ প্যাকেজিংয়ে যাচ্ছে। এতে ৫০০ গ্রাম কেচাপ বোতলে ব্যবহৃত কালি অর্ধেকে নেমে আসবে।

উত্তর জাপানের আওমোরি অঞ্চলের প্রতিষ্ঠান তাইশি ফুডও তাদের বিন স্প্রাউট ও ভাজা টোফুর মোড়ক পরিবর্তন করছে। নতুন প্যাকেটে শব্দ কমানো ও ছোট আকারের ডিজাইন ব্যবহারের মাধ্যমে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কালি সাশ্রয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ভোক্তাদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ
অনেক প্রতিষ্ঠানই আশঙ্কা করছে, দীর্ঘদিনের পরিচিত রঙিন প্যাকেট বদলে গেলে ক্রেতারা পণ্য চিনতে সমস্যায় পড়তে পারেন। তাইশি ফুডের কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত প্যাকেজ পরিবর্তনে ছয় মাস সময় লাগে, কিন্তু সরবরাহ সংকটের কারণে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী ব্র্যান্ড ছাড়া অন্যদের জন্য এই পরিবর্তন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ খাদ্যপণ্যের প্যাকেট শুধু মোড়ক নয়, এটি ব্র্যান্ড পরিচয়েরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যয় কমাতে অনেক প্রতিষ্ঠানকেই এই পথে হাঁটতে হচ্ছে।
গ্রীষ্ম সামনে আসায় সংকট আরও বাড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে আইসক্রিম শিল্পে প্যাকেজিং ঘাটতির কারণে উৎপাদন বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমনকি জাপানের বড় কনভিনিয়েন্স স্টোর চেইন ফ্যামিলিমার্টও তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডের কিছু পণ্যে কালো-সাদা ডিজাইন ব্যবহারের কথা ভাবছে।
জাপানের খাদ্যশিল্পে এই পরিবর্তন শুধু ব্যয় সংকটের প্রতিফলন নয়, বরং বৈশ্বিক সংঘাত কীভাবে দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের চেহারা বদলে দিচ্ছে তারও একটি বড় উদাহরণ।
জাপানের খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি ও কালো-সাদা প্যাকেজিংয়ের প্রবণতা বাড়ছে, সংকটে পড়েছে জনপ্রিয় খাদ্য ব্র্যান্ডগুলো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















