০৯:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬
ভোজ্যতেলের প্যাকেট হবে নির্দিষ্ট মাপে, দাম তুলনা সহজ করতে নতুন নিয়ম ভারতের ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রথম রাজপথে শক্তি প্রদর্শন যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হামলায় নতুন উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিতে ড্রোন-কাণ্ডে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আরও তীব্র বাংলাদেশ ব্যাংক কেন ডলার কিনছে? রিজার্ভ, বিনিময় হার ও অর্থনীতির ভারসাম্যের গল্প খুলনায় বিশেষ অভিযানে কসাই লিটনসহ গ্রেফতার ৫৯ রাতের মধ্যে ১৮ অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কা, নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত তিন কারখানায় ১,৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাই, ঈদের ছুটি শেষে কাজে এসে চাকরি হারানোর অভিযোগ উপসাগরে নতুন উত্তেজনা: কুয়েত-বাহরাইনের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগ ইরানের বিরুদ্ধে মে মাসে গণপিটুনিতে ৩১ জন নিহত, ধর্ষণের শিকার ৮৩ নারী-শিশু ফ্রেঞ্চ ওপেনে ইতিহাস গড়ার লড়াই: শিরোপার ফাইনালে মায়া চওয়ালিন্সকা ও মিরা আন্দ্রেয়েভা

বাংলাদেশ ব্যাংক কেন ডলার কিনছে? রিজার্ভ, বিনিময় হার ও অর্থনীতির ভারসাম্যের গল্প

বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি আবারও বাজার থেকে নিয়মিত ডলার কিনছে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে নিলামের মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার সংগ্রহের এই প্রক্রিয়া অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি করেছে—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকা সত্ত্বেও কেন নতুন করে ডলার কিনতে হচ্ছে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, এর পেছনে শুধু রিজার্ভ বাড়ানোর লক্ষ্য নয়; বরং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ভারসাম্য বজায় রাখা, ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং রফতানি ও রেমিট্যান্স খাতকে সহায়তা করার মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।

রিজার্ভ কী এবং কীভাবে গড়ে ওঠে

বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়কেই সাধারণভাবে দেশের রিজার্ভ বলা হয়। এই অর্থ ব্যবহার করা হয় বিদেশি ঋণ পরিশোধ, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায়।

অনেকের ধারণা, রিজার্ভ মানেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সরাসরি জমা থাকা ডলার। বাস্তবে রফতানি আয় ও প্রবাসী আয়ের ডলার প্রথমে আসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে সেই ডলার কিনে রিজার্ভে যুক্ত করে। ফলে রিজার্ভ বাড়াতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাজার থেকেই ডলার সংগ্রহ করতে হয়।

বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে

কয়েক বছর আগে দেশে ডলারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল। তখন বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে উন্নত হয়েছে।

রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, রফতানি আয়ের উন্নতি এবং অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। এর ফলে অনেক ব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ডলার জমা হচ্ছে।

অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনও পণ্যের সরবরাহ বেশি হলে তার দাম কমে যায়। ডলারের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে ডলারের মূল্য দ্রুত কমে গেলে রফতানিকারক ও প্রবাসী আয় প্রেরণকারীরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

কেন ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখা জরুরি

ডলারের বিনিময় হার হঠাৎ কমে গেলে বিদেশে কর্মরত একজন প্রবাসী একই পরিমাণ ডলার পাঠিয়ে আগের তুলনায় কম টাকা পাবেন। একইভাবে রফতানিকারকরাও ডলার আয়ের বিপরীতে কম পরিমাণ স্থানীয় মুদ্রা অর্জন করবেন।

এই পরিস্থিতি এড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে অতিরিক্ত সরবরাহের একটি অংশ শোষণ করে নেয়। ফলে ডলারের দাম দ্রুত পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।

শুধু রিজার্ভ নয়, বাজার ব্যবস্থাপনাও

ডলার কেনা মানে কেবল রিজার্ভ বাড়ানো নয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার ব্যবস্থাপনা কৌশলও। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন ডলার কেনে, তখন একদিকে রিজার্ভ শক্তিশালী হয়, অন্যদিকে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ কমে যায়। এর ফলে বিনিময় হার একটি গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডলারের দাম অত্যধিক বেড়ে যাওয়া যেমন ক্ষতিকর, তেমনি দ্রুত কমে যাওয়াও অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। উভয় পরিস্থিতিই ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।

রিজার্ভ পুনর্গঠনের সুযোগ

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সময় বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করতে হয়েছিল। তিন অর্থবছরে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে সরবরাহ করা হয়, যা মূলত জ্বালানি, খাদ্যশস্য, সার ও অন্যান্য জরুরি আমদানির ব্যয় মেটাতে ব্যবহৃত হয়।

বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতির ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হারানো রিজার্ভ পুনর্গঠনের সুযোগ পাচ্ছে। সেই লক্ষ্যেই বাজার থেকে ধীরে ধীরে ডলার সংগ্রহ করা হচ্ছে।

আইএমএফের পরামর্শ ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল দীর্ঘদিন ধরে ডলারের বাজারকে আরও বাজারভিত্তিক করার পরামর্শ দিয়ে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিদিন বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনে নিলামের মাধ্যমে ডলার কিনছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে শুধু ডলার কেনাই যথেষ্ট নয়। রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণ এবং আমদানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনা কোনও সংকটের ইঙ্গিত নয়। বরং বাজারে ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং রফতানি-রেমিট্যান্স খাতকে সহায়তা করার একটি অর্থনৈতিক কৌশল।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভোজ্যতেলের প্যাকেট হবে নির্দিষ্ট মাপে, দাম তুলনা সহজ করতে নতুন নিয়ম ভারতের

বাংলাদেশ ব্যাংক কেন ডলার কিনছে? রিজার্ভ, বিনিময় হার ও অর্থনীতির ভারসাম্যের গল্প

০৯:১৯:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি আবারও বাজার থেকে নিয়মিত ডলার কিনছে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে নিলামের মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার সংগ্রহের এই প্রক্রিয়া অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি করেছে—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকা সত্ত্বেও কেন নতুন করে ডলার কিনতে হচ্ছে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, এর পেছনে শুধু রিজার্ভ বাড়ানোর লক্ষ্য নয়; বরং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ভারসাম্য বজায় রাখা, ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং রফতানি ও রেমিট্যান্স খাতকে সহায়তা করার মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।

রিজার্ভ কী এবং কীভাবে গড়ে ওঠে

বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়কেই সাধারণভাবে দেশের রিজার্ভ বলা হয়। এই অর্থ ব্যবহার করা হয় বিদেশি ঋণ পরিশোধ, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায়।

অনেকের ধারণা, রিজার্ভ মানেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সরাসরি জমা থাকা ডলার। বাস্তবে রফতানি আয় ও প্রবাসী আয়ের ডলার প্রথমে আসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে সেই ডলার কিনে রিজার্ভে যুক্ত করে। ফলে রিজার্ভ বাড়াতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাজার থেকেই ডলার সংগ্রহ করতে হয়।

বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে

কয়েক বছর আগে দেশে ডলারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল। তখন বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে উন্নত হয়েছে।

রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, রফতানি আয়ের উন্নতি এবং অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। এর ফলে অনেক ব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ডলার জমা হচ্ছে।

অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনও পণ্যের সরবরাহ বেশি হলে তার দাম কমে যায়। ডলারের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে ডলারের মূল্য দ্রুত কমে গেলে রফতানিকারক ও প্রবাসী আয় প্রেরণকারীরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

কেন ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখা জরুরি

ডলারের বিনিময় হার হঠাৎ কমে গেলে বিদেশে কর্মরত একজন প্রবাসী একই পরিমাণ ডলার পাঠিয়ে আগের তুলনায় কম টাকা পাবেন। একইভাবে রফতানিকারকরাও ডলার আয়ের বিপরীতে কম পরিমাণ স্থানীয় মুদ্রা অর্জন করবেন।

এই পরিস্থিতি এড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে অতিরিক্ত সরবরাহের একটি অংশ শোষণ করে নেয়। ফলে ডলারের দাম দ্রুত পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।

শুধু রিজার্ভ নয়, বাজার ব্যবস্থাপনাও

ডলার কেনা মানে কেবল রিজার্ভ বাড়ানো নয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার ব্যবস্থাপনা কৌশলও। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন ডলার কেনে, তখন একদিকে রিজার্ভ শক্তিশালী হয়, অন্যদিকে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ কমে যায়। এর ফলে বিনিময় হার একটি গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডলারের দাম অত্যধিক বেড়ে যাওয়া যেমন ক্ষতিকর, তেমনি দ্রুত কমে যাওয়াও অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। উভয় পরিস্থিতিই ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।

রিজার্ভ পুনর্গঠনের সুযোগ

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সময় বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করতে হয়েছিল। তিন অর্থবছরে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে সরবরাহ করা হয়, যা মূলত জ্বালানি, খাদ্যশস্য, সার ও অন্যান্য জরুরি আমদানির ব্যয় মেটাতে ব্যবহৃত হয়।

বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতির ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হারানো রিজার্ভ পুনর্গঠনের সুযোগ পাচ্ছে। সেই লক্ষ্যেই বাজার থেকে ধীরে ধীরে ডলার সংগ্রহ করা হচ্ছে।

আইএমএফের পরামর্শ ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল দীর্ঘদিন ধরে ডলারের বাজারকে আরও বাজারভিত্তিক করার পরামর্শ দিয়ে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিদিন বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনে নিলামের মাধ্যমে ডলার কিনছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে শুধু ডলার কেনাই যথেষ্ট নয়। রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণ এবং আমদানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনা কোনও সংকটের ইঙ্গিত নয়। বরং বাজারে ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং রফতানি-রেমিট্যান্স খাতকে সহায়তা করার একটি অর্থনৈতিক কৌশল।