১০:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
টোকিও ট্রায়াল: অসমাপ্ত ন্যায়বিচারের দীর্ঘ ছায়া নতুন ‘কমিক’ নকশায় এয়ার জর্ডান ৪, অনলাইনে কিনতে পারবেন আজই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড় এত দ্রুত, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় এর নির্মাতারাও সৌদি আরবের পরমাণু চুক্তিতে বিশ্বজুড়ে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার শঙ্কা নির্বাচনের মুখোশ খুলে ফেললে গণতন্ত্রের সামনে যে ভয়াবহ বিপদ অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে নতুন আশার আলো, ওষুধ উদ্ভাবনে আমেরিকার মডেল নিয়ে নতুন আলোচনা ইরানে ফের মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, কূটনৈতিক সমাধানের পথ এখনো অনিশ্চিত বজ্রপাতের পর কানাডায় ভয়াবহ দাবানল, পুড়েছে ২৯ লাখ হেক্টর বন মেয়ের উচ্চতা বাড়াতে মাসে ৬৬ হাজার টাকা খরচ বাবার, চীনে তুমুল বিতর্ক বাংলাদেশে বছরে পানিতে ডুবে ৯ হাজার ৬০০ মানুষের মৃত্যু, সবচেয়ে ঝুঁকিতে শিশুরা

টোকিও ট্রায়াল: অসমাপ্ত ন্যায়বিচারের দীর্ঘ ছায়া

  • লি নান
  • ১০:০০:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
  • 2

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যবস্থা একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিল—যুদ্ধের নামে সংঘটিত নৃশংসতার বিচার কীভাবে হবে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ১৯৪৬ সালে টোকিওতে বসে আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনাল। জাপানের শীর্ষ যুদ্ধকালীন নেতাদের বিচারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনকে নতুন ভিত্তি দেওয়ার চেষ্টা হয়। কিন্তু বিচার শেষ হওয়ার বহু দশক পরও ইতিহাসবিদদের কাছে একটি প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে গেছে: এটি কি সত্যিকার অর্থে পূর্ণাঙ্গ বিচার ছিল, নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে আপস করা একটি আইনি প্রক্রিয়া?

আড়াই বছরের বিচার শেষে অভিযুক্ত ২৫ জনকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়। কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, অনেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পান। আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু একই সঙ্গে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা বিচারটির নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে আজও বিতর্কের কেন্দ্রে রেখে দিয়েছে। বিশেষ করে জাপানের সম্রাট এবং জৈবিক যুদ্ধ কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিচারের বাইরে রাখা ইতিহাসে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে আছে।

অনেকে মনে করেন, প্রমাণের অভাব ছিল না; বরং যুদ্ধশেষে প্রমাণ সংগ্রহই ছিল সবচেয়ে বড় লড়াই। জাপানি সামরিক কর্তৃপক্ষ বিপুল পরিমাণ সরকারি নথি ধ্বংস করে দেয়। তবু তদন্তকারীরা অল্প সময়ের মধ্যে চীনের বিভিন্ন শহরে ছুটে বেড়িয়ে শত শত প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য সংগ্রহ করেন। কখনও একদিনেই শতাধিক সাক্ষীর বয়ান নেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা আইনজীবীরা বারবার দাবি করেছিলেন যে একই ধরনের প্রমাণ অতিরিক্তভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু এই অভিযোগের আড়ালেও প্রসিকিউশন এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়, যা যুদ্ধকালীন ঘটনাবলির নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে আজও বিবেচিত হয়।

Nuremberg trials | Summary, Significance, Defendants, History, Judges,  Sentences, & Why They Happened | Britannica

এই নথিগুলোর মধ্যে ছিল দখল-পরবর্তী নানজিং সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক বার্তা, জার্মান রাষ্ট্রদূতের গোপন প্রতিবেদন এবং নানজিং সেফটি জোন ও আন্তর্জাতিক ত্রাণ কমিটির সংরক্ষিত পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড। যুদ্ধাপরাধের বিচার শুধু প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করেনি; আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সংগৃহীত এসব নথিও ঘটনাগুলোর ঐতিহাসিক সত্যতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

তবু সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়টি রয়ে যায় জৈবিক ও রাসায়নিক যুদ্ধের অভিযোগ ঘিরে। তদন্তকারীরা চীনের চাংশায় প্লেগ সংক্রমণের পেছনে জাপানি বাহিনীর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে বিস্তৃত অনুসন্ধান চালান। চিকিৎসক, গবেষক এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, প্রমাণ সংগ্রহ করা হয় এবং আরও সাক্ষ্য নিশ্চিত করার সুপারিশও করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব অভিযোগ বিচারিক পর্যায়ে আর এগোয়নি। পরবর্তীকালে ইউনিট ৭৩১-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের গবেষণালব্ধ তথ্যের বিনিময়ে দায়মুক্তি দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত যুদ্ধাপরাধ বিচারের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত সমঝোতা হিসেবে বিবেচিত।

এই অসম্পূর্ণতার পেছনে কেবল আইনি সীমাবদ্ধতা নয়, ভূরাজনৈতিক হিসাবও কাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছিলেন যে সম্রাট হিরোহিতোর বিরুদ্ধে মামলা হলে জাপানের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে এবং দেশটিকে দীর্ঘদিন সামরিক নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। বাস্তবে তিনি এমন একটি জাপান চেয়েছিলেন, যা যুদ্ধোত্তর কৌশলগত পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে পারে। সে কারণে সম্রাটকে বিচারের আওতার বাইরে রাখা কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি ছিল বৃহত্তর কৌশলগত বিবেচনার অংশ।

এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয় ইউরোপের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করলে। জার্মানির শীর্ষ নাৎসি নেতাদের বিরুদ্ধে ন্যুরেমবার্গে যে বিচার হয়েছিল, সেখানে সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতার অজুহাতে বিচার সীমিত করা হয়নি। ফলে জার্মানি ধীরে ধীরে নিজের অতীতের মুখোমুখি হওয়ার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে সক্ষম হয়। বিপরীতে জাপানে সেই আত্মসমালোচনার পথ কখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যুদ্ধকালীন ইতিহাস নিয়ে পাঠ্যপুস্তক বিতর্ক, ইয়াসুকুনি মন্দিরকে ঘিরে বিরোধ কিংবা ‘কমফোর্ট উইমেন’ প্রসঙ্গে অস্বীকারের রাজনীতি—এসবের শিকড় অনেক বিশ্লেষকের মতে টোকিও ট্রায়ালের সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নিহিত।

International Military Tribunal for the Far East - Wikipedia

তবে বিচারটির গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগও নেই। আন্তর্জাতিক আইন প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে আগ্রাসী যুদ্ধ নিজেই একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বও ব্যক্তিগতভাবে তার জন্য দায়ী হতে পারে। যুদ্ধ পরিচালনার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এনে টোকিও ট্রায়াল পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার জন্য একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে। এটি দেখিয়েছিল যে রাষ্ট্রক্ষমতা অপরাধের ঢাল হতে পারে না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই বিচার ভুক্তভোগীদের স্মৃতিকে কেবল ইতিহাসের পাদটীকায় সীমাবদ্ধ রাখেনি। নানজিং হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি সংরক্ষণ, গবেষণা, জনশিক্ষা এবং জাতীয় স্মরণানুষ্ঠানের মাধ্যমে ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা গড়ে উঠেছে। বিচার এবং স্মৃতিচর্চা—এই দুই প্রক্রিয়া একসঙ্গে অতীতের নৃশংসতাকে ভুলে না গিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার ভিত্তি নির্মাণের চেষ্টা করেছে।

টোকিও ট্রায়াল তাই একই সঙ্গে সাফল্য এবং অপূর্ণতার ইতিহাস। এটি আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে, কিন্তু রাজনৈতিক আপসের কারণে ন্যায়বিচারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অসমাপ্ত রেখেছে। ইতিহাসের এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত বিচার কেবল রায় ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর ভিত্তি হতে হয় নিরপেক্ষ প্রমাণ, জবাবদিহি এবং অতীতের সত্যকে স্বীকার করার সাহসে। যখন সেই তিনটি উপাদান একসঙ্গে উপস্থিত থাকে, তখনই বিচার ভবিষ্যতের শান্তি ও মানবিকতার জন্য স্থায়ী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

টোকিও ট্রায়াল: অসমাপ্ত ন্যায়বিচারের দীর্ঘ ছায়া

টোকিও ট্রায়াল: অসমাপ্ত ন্যায়বিচারের দীর্ঘ ছায়া

১০:০০:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যবস্থা একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিল—যুদ্ধের নামে সংঘটিত নৃশংসতার বিচার কীভাবে হবে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ১৯৪৬ সালে টোকিওতে বসে আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনাল। জাপানের শীর্ষ যুদ্ধকালীন নেতাদের বিচারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনকে নতুন ভিত্তি দেওয়ার চেষ্টা হয়। কিন্তু বিচার শেষ হওয়ার বহু দশক পরও ইতিহাসবিদদের কাছে একটি প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে গেছে: এটি কি সত্যিকার অর্থে পূর্ণাঙ্গ বিচার ছিল, নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে আপস করা একটি আইনি প্রক্রিয়া?

আড়াই বছরের বিচার শেষে অভিযুক্ত ২৫ জনকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়। কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, অনেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পান। আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু একই সঙ্গে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা বিচারটির নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে আজও বিতর্কের কেন্দ্রে রেখে দিয়েছে। বিশেষ করে জাপানের সম্রাট এবং জৈবিক যুদ্ধ কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিচারের বাইরে রাখা ইতিহাসে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে আছে।

অনেকে মনে করেন, প্রমাণের অভাব ছিল না; বরং যুদ্ধশেষে প্রমাণ সংগ্রহই ছিল সবচেয়ে বড় লড়াই। জাপানি সামরিক কর্তৃপক্ষ বিপুল পরিমাণ সরকারি নথি ধ্বংস করে দেয়। তবু তদন্তকারীরা অল্প সময়ের মধ্যে চীনের বিভিন্ন শহরে ছুটে বেড়িয়ে শত শত প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য সংগ্রহ করেন। কখনও একদিনেই শতাধিক সাক্ষীর বয়ান নেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা আইনজীবীরা বারবার দাবি করেছিলেন যে একই ধরনের প্রমাণ অতিরিক্তভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু এই অভিযোগের আড়ালেও প্রসিকিউশন এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়, যা যুদ্ধকালীন ঘটনাবলির নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে আজও বিবেচিত হয়।

Nuremberg trials | Summary, Significance, Defendants, History, Judges,  Sentences, & Why They Happened | Britannica

এই নথিগুলোর মধ্যে ছিল দখল-পরবর্তী নানজিং সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক বার্তা, জার্মান রাষ্ট্রদূতের গোপন প্রতিবেদন এবং নানজিং সেফটি জোন ও আন্তর্জাতিক ত্রাণ কমিটির সংরক্ষিত পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড। যুদ্ধাপরাধের বিচার শুধু প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করেনি; আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সংগৃহীত এসব নথিও ঘটনাগুলোর ঐতিহাসিক সত্যতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

তবু সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়টি রয়ে যায় জৈবিক ও রাসায়নিক যুদ্ধের অভিযোগ ঘিরে। তদন্তকারীরা চীনের চাংশায় প্লেগ সংক্রমণের পেছনে জাপানি বাহিনীর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে বিস্তৃত অনুসন্ধান চালান। চিকিৎসক, গবেষক এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, প্রমাণ সংগ্রহ করা হয় এবং আরও সাক্ষ্য নিশ্চিত করার সুপারিশও করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব অভিযোগ বিচারিক পর্যায়ে আর এগোয়নি। পরবর্তীকালে ইউনিট ৭৩১-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের গবেষণালব্ধ তথ্যের বিনিময়ে দায়মুক্তি দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত যুদ্ধাপরাধ বিচারের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত সমঝোতা হিসেবে বিবেচিত।

এই অসম্পূর্ণতার পেছনে কেবল আইনি সীমাবদ্ধতা নয়, ভূরাজনৈতিক হিসাবও কাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছিলেন যে সম্রাট হিরোহিতোর বিরুদ্ধে মামলা হলে জাপানের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে এবং দেশটিকে দীর্ঘদিন সামরিক নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। বাস্তবে তিনি এমন একটি জাপান চেয়েছিলেন, যা যুদ্ধোত্তর কৌশলগত পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে পারে। সে কারণে সম্রাটকে বিচারের আওতার বাইরে রাখা কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি ছিল বৃহত্তর কৌশলগত বিবেচনার অংশ।

এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয় ইউরোপের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করলে। জার্মানির শীর্ষ নাৎসি নেতাদের বিরুদ্ধে ন্যুরেমবার্গে যে বিচার হয়েছিল, সেখানে সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতার অজুহাতে বিচার সীমিত করা হয়নি। ফলে জার্মানি ধীরে ধীরে নিজের অতীতের মুখোমুখি হওয়ার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে সক্ষম হয়। বিপরীতে জাপানে সেই আত্মসমালোচনার পথ কখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যুদ্ধকালীন ইতিহাস নিয়ে পাঠ্যপুস্তক বিতর্ক, ইয়াসুকুনি মন্দিরকে ঘিরে বিরোধ কিংবা ‘কমফোর্ট উইমেন’ প্রসঙ্গে অস্বীকারের রাজনীতি—এসবের শিকড় অনেক বিশ্লেষকের মতে টোকিও ট্রায়ালের সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নিহিত।

International Military Tribunal for the Far East - Wikipedia

তবে বিচারটির গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগও নেই। আন্তর্জাতিক আইন প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে আগ্রাসী যুদ্ধ নিজেই একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বও ব্যক্তিগতভাবে তার জন্য দায়ী হতে পারে। যুদ্ধ পরিচালনার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এনে টোকিও ট্রায়াল পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার জন্য একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে। এটি দেখিয়েছিল যে রাষ্ট্রক্ষমতা অপরাধের ঢাল হতে পারে না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই বিচার ভুক্তভোগীদের স্মৃতিকে কেবল ইতিহাসের পাদটীকায় সীমাবদ্ধ রাখেনি। নানজিং হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি সংরক্ষণ, গবেষণা, জনশিক্ষা এবং জাতীয় স্মরণানুষ্ঠানের মাধ্যমে ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা গড়ে উঠেছে। বিচার এবং স্মৃতিচর্চা—এই দুই প্রক্রিয়া একসঙ্গে অতীতের নৃশংসতাকে ভুলে না গিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার ভিত্তি নির্মাণের চেষ্টা করেছে।

টোকিও ট্রায়াল তাই একই সঙ্গে সাফল্য এবং অপূর্ণতার ইতিহাস। এটি আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে, কিন্তু রাজনৈতিক আপসের কারণে ন্যায়বিচারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অসমাপ্ত রেখেছে। ইতিহাসের এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত বিচার কেবল রায় ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর ভিত্তি হতে হয় নিরপেক্ষ প্রমাণ, জবাবদিহি এবং অতীতের সত্যকে স্বীকার করার সাহসে। যখন সেই তিনটি উপাদান একসঙ্গে উপস্থিত থাকে, তখনই বিচার ভবিষ্যতের শান্তি ও মানবিকতার জন্য স্থায়ী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।