১০:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
টোকিও ট্রায়াল: অসমাপ্ত ন্যায়বিচারের দীর্ঘ ছায়া নতুন ‘কমিক’ নকশায় এয়ার জর্ডান ৪, অনলাইনে কিনতে পারবেন আজই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড় এত দ্রুত, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় এর নির্মাতারাও সৌদি আরবের পরমাণু চুক্তিতে বিশ্বজুড়ে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার শঙ্কা নির্বাচনের মুখোশ খুলে ফেললে গণতন্ত্রের সামনে যে ভয়াবহ বিপদ অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে নতুন আশার আলো, ওষুধ উদ্ভাবনে আমেরিকার মডেল নিয়ে নতুন আলোচনা ইরানে ফের মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, কূটনৈতিক সমাধানের পথ এখনো অনিশ্চিত বজ্রপাতের পর কানাডায় ভয়াবহ দাবানল, পুড়েছে ২৯ লাখ হেক্টর বন মেয়ের উচ্চতা বাড়াতে মাসে ৬৬ হাজার টাকা খরচ বাবার, চীনে তুমুল বিতর্ক বাংলাদেশে বছরে পানিতে ডুবে ৯ হাজার ৬০০ মানুষের মৃত্যু, সবচেয়ে ঝুঁকিতে শিশুরা

সৌদি আরবের পরমাণু চুক্তিতে বিশ্বজুড়ে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার শঙ্কা

সৌদি আরবকে পরমাণু কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের করা নতুন চুক্তি মধ্যপ্রাচ্য তো বটেই, গোটা বিশ্বে পরমাণু অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। চুক্তিটি এখনো পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি। তবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এতে সৌদি আরবকে নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি থেকে স্থায়ীভাবে বিরত থাকার বাধ্যবাধকতা থাকছে না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার ঠেকাতে যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সেটি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আমিরাতের সঙ্গে কঠোর শর্ত, সৌদির ক্ষেত্রে ছাড়

২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু সহযোগিতা চুক্তিতে কঠোর শর্ত রাখা হয়েছিল। আমিরাতকে নিজেদের দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ না করার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। পাশাপাশি পরমাণু স্থাপনাগুলোতে আরও কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের ব্যবস্থাও মেনে নেয় দেশটি।

এর ফলে আমিরাতের সঙ্গে করা চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে আদর্শ মডেল হিসেবে তুলে ধরেছেন। বর্তমানে দেশটির চারটি পরমাণু চুল্লি জাতীয় বিদ্যুতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সরবরাহ করছে।

কিন্তু সৌদি আরবের সঙ্গে নতুন চুক্তিতে একই ধরনের কঠোর শর্ত থাকছে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। বরং দুই দেশ দুই বছর ধরে সৌদি আরবের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রয়োজন আছে কি না, তা পর্যালোচনা করবে। প্রয়োজন আছে বলে সিদ্ধান্ত হলে সৌদি ভূখণ্ডেই এমন একটি স্থাপনা নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করতে পারে। আর প্রয়োজন নেই বলে সিদ্ধান্ত হলে সৌদি আরব আগামী ১০ বছর এ ধরনের কর্মসূচি না চালানোর অঙ্গীকার করবে।

পরমাণু বিস্তার রোধের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় চাপ

এই চুক্তির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব। পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি কয়েক দশক ধরে বিশ্বে পরমাণু অস্ত্র ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

সৌদি আরব যদি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ পায়, তাহলে অন্য দেশগুলোও একই দাবি তুলতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যে পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের আগ্রহ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় ইতোমধ্যে নিজেদের পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্রের হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ভবিষ্যতে কতটা নির্ভরযোগ্য থাকবে, তা নিয়ে সেখানে উদ্বেগ রয়েছে। জাপানেও পরমাণু অস্ত্র নীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের দাবি উঠেছে।

ইরান ও ইসরায়েলকে ঘিরে বাড়তে পারে উত্তেজনা

সৌদি আরবের জন্য তুলনামূলক নমনীয় চুক্তি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু আলোচনাকেও জটিল করে তুলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে চাপ দেয়, তাহলে তেহরান প্রশ্ন তুলতে পারে—সৌদি আরবকে একই সুযোগ দেওয়া হলে তাদের ক্ষেত্রে এত কঠোর শর্ত কেন?

অন্যদিকে ইসরায়েলও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রকাশ্যে স্বীকৃত একমাত্র পরমাণু শক্তিধর দেশ হিসেবে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে আসছে।

সৌদি আরবের সম্ভাব্য পরমাণু সক্ষমতা তুরস্কের মতো অন্য আঞ্চলিক শক্তিকেও ভবিষ্যতে একই পথে হাঁটার কথা ভাবতে উৎসাহিত করতে পারে।

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন ইসরায়েল - দৈনিক আজাদী

সৌদির পরমাণু বিদ্যুতের প্রয়োজন কেন

সৌদি আরবের পরমাণু বিদ্যুৎ কর্মসূচির পেছনে অবশ্য বাস্তব অর্থনৈতিক কারণও রয়েছে। দেশটিতে গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেলও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়।

পরমাণু বিদ্যুৎ চালু হলে তেল পোড়ানোর চাপ কমবে এবং সেই তেল আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করে আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। ফলে বেসামরিক পরমাণু বিদ্যুৎ কর্মসূচির অর্থনৈতিক যুক্তি সৌদি আরবের জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী।

তবে বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি থেকে সামরিক পরমাণু সক্ষমতার দিকে যাওয়ার সম্ভাবনাই আন্তর্জাতিক মহলের মূল উদ্বেগ।

বদলে যেতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা হিসাব

সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে নিশ্চয়তা নেই। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান অতীতে বলেছেন, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করলে সৌদি আরবও নিজেদের পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে যেতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত ও উত্তেজনা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। ফলে সৌদি আরবের বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচির ভেতরে ভবিষ্যতে সামরিক সক্ষমতার সম্ভাবনা তৈরি হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক হিসাব

সৌদি আরবের সঙ্গে পরমাণু সহযোগিতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থও রয়েছে। আগে ধারণা করা হয়েছিল, এমন একটি চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ তৈরি হবে। কিন্তু গাজা যুদ্ধের পর সেই সম্ভাবনা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এখন চুক্তিটিকে মধ্যপ্রাচ্যে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব ঠেকানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ধরে রাখতে ওয়াশিংটনের জন্য পরমাণু সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে

সৌদি আরবে শেষ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা তৈরি হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। দুই বছরের পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রেসিডেন্টও দায়িত্ব নিতে পারেন। ফলে বর্তমান চুক্তির ভবিষ্যৎও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করতে পারে।

তবে এর মধ্যেই যে ঝুঁকিটি তৈরি হয়েছে, তা হলো পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের নতুন প্রতিযোগিতা। সৌদি আরব যদি তুলনামূলক সহজ শর্তে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ পায়, তাহলে অন্য দেশগুলোর কাছেও একই ধরনের দাবি তোলার যুক্তি তৈরি হবে।

পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধের আন্তর্জাতিক কাঠামো ভাঙে সাধারণত একদিনে নয়, ধীরে ধীরে। মিত্র দেশগুলোর বেসামরিক কর্মসূচির নামে সম্ভাব্য সামরিক সক্ষমতা তৈরির সুযোগ বাড়তে থাকলে সেই ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যেতে পারে। তাই সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে আরও কঠোর ও স্পষ্ট নিরাপত্তা শর্ত নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

টোকিও ট্রায়াল: অসমাপ্ত ন্যায়বিচারের দীর্ঘ ছায়া

সৌদি আরবের পরমাণু চুক্তিতে বিশ্বজুড়ে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার শঙ্কা

০৯:০৫:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

সৌদি আরবকে পরমাণু কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের করা নতুন চুক্তি মধ্যপ্রাচ্য তো বটেই, গোটা বিশ্বে পরমাণু অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। চুক্তিটি এখনো পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি। তবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এতে সৌদি আরবকে নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি থেকে স্থায়ীভাবে বিরত থাকার বাধ্যবাধকতা থাকছে না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার ঠেকাতে যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সেটি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আমিরাতের সঙ্গে কঠোর শর্ত, সৌদির ক্ষেত্রে ছাড়

২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু সহযোগিতা চুক্তিতে কঠোর শর্ত রাখা হয়েছিল। আমিরাতকে নিজেদের দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ না করার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। পাশাপাশি পরমাণু স্থাপনাগুলোতে আরও কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের ব্যবস্থাও মেনে নেয় দেশটি।

এর ফলে আমিরাতের সঙ্গে করা চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে আদর্শ মডেল হিসেবে তুলে ধরেছেন। বর্তমানে দেশটির চারটি পরমাণু চুল্লি জাতীয় বিদ্যুতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সরবরাহ করছে।

কিন্তু সৌদি আরবের সঙ্গে নতুন চুক্তিতে একই ধরনের কঠোর শর্ত থাকছে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। বরং দুই দেশ দুই বছর ধরে সৌদি আরবের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রয়োজন আছে কি না, তা পর্যালোচনা করবে। প্রয়োজন আছে বলে সিদ্ধান্ত হলে সৌদি ভূখণ্ডেই এমন একটি স্থাপনা নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করতে পারে। আর প্রয়োজন নেই বলে সিদ্ধান্ত হলে সৌদি আরব আগামী ১০ বছর এ ধরনের কর্মসূচি না চালানোর অঙ্গীকার করবে।

পরমাণু বিস্তার রোধের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় চাপ

এই চুক্তির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব। পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি কয়েক দশক ধরে বিশ্বে পরমাণু অস্ত্র ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

সৌদি আরব যদি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ পায়, তাহলে অন্য দেশগুলোও একই দাবি তুলতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যে পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের আগ্রহ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় ইতোমধ্যে নিজেদের পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্রের হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ভবিষ্যতে কতটা নির্ভরযোগ্য থাকবে, তা নিয়ে সেখানে উদ্বেগ রয়েছে। জাপানেও পরমাণু অস্ত্র নীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের দাবি উঠেছে।

ইরান ও ইসরায়েলকে ঘিরে বাড়তে পারে উত্তেজনা

সৌদি আরবের জন্য তুলনামূলক নমনীয় চুক্তি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু আলোচনাকেও জটিল করে তুলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে চাপ দেয়, তাহলে তেহরান প্রশ্ন তুলতে পারে—সৌদি আরবকে একই সুযোগ দেওয়া হলে তাদের ক্ষেত্রে এত কঠোর শর্ত কেন?

অন্যদিকে ইসরায়েলও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রকাশ্যে স্বীকৃত একমাত্র পরমাণু শক্তিধর দেশ হিসেবে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে আসছে।

সৌদি আরবের সম্ভাব্য পরমাণু সক্ষমতা তুরস্কের মতো অন্য আঞ্চলিক শক্তিকেও ভবিষ্যতে একই পথে হাঁটার কথা ভাবতে উৎসাহিত করতে পারে।

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন ইসরায়েল - দৈনিক আজাদী

সৌদির পরমাণু বিদ্যুতের প্রয়োজন কেন

সৌদি আরবের পরমাণু বিদ্যুৎ কর্মসূচির পেছনে অবশ্য বাস্তব অর্থনৈতিক কারণও রয়েছে। দেশটিতে গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেলও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়।

পরমাণু বিদ্যুৎ চালু হলে তেল পোড়ানোর চাপ কমবে এবং সেই তেল আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করে আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। ফলে বেসামরিক পরমাণু বিদ্যুৎ কর্মসূচির অর্থনৈতিক যুক্তি সৌদি আরবের জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী।

তবে বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি থেকে সামরিক পরমাণু সক্ষমতার দিকে যাওয়ার সম্ভাবনাই আন্তর্জাতিক মহলের মূল উদ্বেগ।

বদলে যেতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা হিসাব

সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে নিশ্চয়তা নেই। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান অতীতে বলেছেন, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করলে সৌদি আরবও নিজেদের পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে যেতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত ও উত্তেজনা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। ফলে সৌদি আরবের বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচির ভেতরে ভবিষ্যতে সামরিক সক্ষমতার সম্ভাবনা তৈরি হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক হিসাব

সৌদি আরবের সঙ্গে পরমাণু সহযোগিতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থও রয়েছে। আগে ধারণা করা হয়েছিল, এমন একটি চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ তৈরি হবে। কিন্তু গাজা যুদ্ধের পর সেই সম্ভাবনা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এখন চুক্তিটিকে মধ্যপ্রাচ্যে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব ঠেকানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ধরে রাখতে ওয়াশিংটনের জন্য পরমাণু সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে

সৌদি আরবে শেষ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা তৈরি হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। দুই বছরের পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রেসিডেন্টও দায়িত্ব নিতে পারেন। ফলে বর্তমান চুক্তির ভবিষ্যৎও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করতে পারে।

তবে এর মধ্যেই যে ঝুঁকিটি তৈরি হয়েছে, তা হলো পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের নতুন প্রতিযোগিতা। সৌদি আরব যদি তুলনামূলক সহজ শর্তে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ পায়, তাহলে অন্য দেশগুলোর কাছেও একই ধরনের দাবি তোলার যুক্তি তৈরি হবে।

পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধের আন্তর্জাতিক কাঠামো ভাঙে সাধারণত একদিনে নয়, ধীরে ধীরে। মিত্র দেশগুলোর বেসামরিক কর্মসূচির নামে সম্ভাব্য সামরিক সক্ষমতা তৈরির সুযোগ বাড়তে থাকলে সেই ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যেতে পারে। তাই সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে আরও কঠোর ও স্পষ্ট নিরাপত্তা শর্ত নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।