ইরানে আবারও হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার দেশটির বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সময়ে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত এরই মধ্যে হাজারো মানুষের প্রাণ কেড়েছে। যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও।
‘আরও বড় সামরিক শাস্তি’র হুমকি
সারাক্ষণ রিপোর্ট জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। দেশটির জ্বালানি স্থাপনা, সেতু এবং গভীর ভূগর্ভস্থ পরমাণু-সম্পর্কিত স্থাপনায় হামলার সম্ভাবনার কথাও তিনি আগেই জানিয়েছিলেন।
এমনকি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেলকেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলে স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনাও সামনে এসেছে। তবে শুক্রবার নতুন করে বড় ধরনের হামলার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।
তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং দেশটি আগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে সমঝোতা না হলে সামরিক অভিযান আরও কঠোর হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
ইরানের পাল্টা হামলা
মার্কিন হামলার জবাবে ইরান আশপাশের আরব দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে এসব দেশে মার্কিন কর্মীরা ব্যবহার করেন—এমন বেসামরিক স্থাপনাগুলোও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে সতর্ক করেছে তেহরান।
ইরানের সামরিক বাহিনীর দাবি, কুয়েতের উত্তরাঞ্চলে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম রাখার স্থাপনা এবং কুয়েত সিটির কাছাকাছি কয়েকটি মার্কিন সেনাঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ব্যবহৃত একটি নজরদারি টাওয়ারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড।
কুয়েতও জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া কিছু ‘শত্রুতামূলক’ লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করতে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়েছিল।
হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর ৫৯ জন নিহত এবং ৬৬৬ জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ১৮ সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আহত মার্কিন সেনার সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে।
ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডের একজন কর্মকর্তা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরানি নিহতদের প্রতিটি প্রাণের জবাবে একজন করে মার্কিন সেনাকে হত্যার লক্ষ্য নিয়ে তারা এগোবেন।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে পারস্য উপসাগরের প্রবেশপথ হরমুজ প্রণালি। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনের হুতিদের হামলার আশঙ্কায় বেশ কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ দীর্ঘ পথ বেছে নিয়ে সুয়েজ খাল হয়ে এশিয়ার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় দুটোই বাড়ছে।
বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী জাহাজে হামলার পর বৃহস্পতিবার তেলের দাম প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে পৌঁছেছিল। শুক্রবার অবশ্য ব্রেন্ট তেলের দাম ৪ ডলারের বেশি কমে ৯৬ ডলারের কিছু ওপরে নেমে আসে।

আলোচনার উদ্যোগে পাকিস্তান
যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক তৎপরতাও শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থগিত হয়ে থাকা আলোচনা আবার শুরু করার পথ খুঁজছে পাকিস্তান। এর আগে চীনও আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইস্কান্দার মোমেনির সাম্প্রতিক ইসলামাবাদ সফরকে ঘিরে এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। মাত্র ১০ দিনের মধ্যে এটি ছিল তার দ্বিতীয় পাকিস্তান সফর।
সৌদি আরবেও হামলার প্রভাব
হুতিদের হামলার কারণে সৌদি আরবের তেল পরিবহন ব্যবস্থাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের দিকে পাঠানো হচ্ছে।
শুক্রবার লোহিত সাগরে একটি সৌদি জাহাজ হামলার শিকার হয়ে সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এর জবাবে ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।
সব মিলিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন শুধু সামরিক লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও এর প্রভাব বাড়ছে। ফলে যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হবে, নাকি সংঘাত আরও বিস্তৃত হবে—সেদিকেই এখন নজর পুরো বিশ্বের।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের নতুন উত্তেজনা ও কূটনৈতিক সমাধানের অনিশ্চয়তা বিশ্বজুড়ে বাড়াচ্ছে উদ্বেগ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















