কানাডায় চলতি বছরের ভয়াবহ দাবানল পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। গত এক সপ্তাহে প্রায় ৩৪ হাজার বজ্রপাতের পর দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে নতুন করে একের পর এক আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। একই সময়ে অন্টারিওর বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলেও আগুন জ্বলছে। পরিস্থিতিকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে তীব্র দাবানল মৌসুমগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দক্ষিণ ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় আগুনের কারণে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ২৫টি এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ জারি ছিল। প্রদেশটিতে সক্রিয় দাবানলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯০টিতে। তাপমাত্রা বাড়তে থাকা এবং আবহাওয়া ক্রমেই শুষ্ক হয়ে পড়ায় আগুন আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বজ্রপাতেই নতুন করে আগুনের বিস্তার
কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলে উষ্ণ আবহাওয়া ও বজ্রঝড়ের কারণে একের পর এক দাবানল শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার কিম্বার্লির কাছে কয়েকটি আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করা কর্মকর্তা হিউ মারডক জানান, আগামী কয়েক দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস আগুন নেভানোর জন্য খুব একটা সহায়ক নয়।
তার মতে, প্রকৃতির কাছ থেকে শিগগিরই আগুন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে দমকলকর্মীদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
ছড়িয়ে পড়ছে দাবানলের ধোঁয়া
দাবানলের ধোঁয়া শুধু কানাডার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। গত সপ্তাহে আগুনের ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চল ও মধ্য-পশ্চিমের বেশ কয়েকটি বড় শহর পর্যন্ত পৌঁছেছে। এতে বায়ুর মান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আলবার্টার বানফ ও আশপাশের এলাকায় শুক্রবার নিম্নমানের বায়ুর বিষয়ে সতর্কতা জারি করা হয়। তবে সপ্তাহান্তে বেশির ভাগ এলাকায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
লাখো হেক্টর বন পুড়ে ছাই
চলতি বছর এখন পর্যন্ত কানাডায় প্রায় ২৯ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমি দাবানলে পুড়ে গেছে। গত ১০ বছরের গড় হিসাবে একই সময়ে প্রায় ২৫ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমি পুড়েছিল। অর্থাৎ এবার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ স্বাভাবিক গড়ের চেয়েও বেশি।
বর্তমানে কানাডায় সক্রিয় দাবানলের সংখ্যাও গত দুই বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি। আগুন থেকে বাঁচতে হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সম্প্রদায়ও রয়েছে।
কানাডার বনাঞ্চল বিশ্বের মোট উত্তরাঞ্চলীয় শঙ্কুযুক্ত বনভূমির প্রায় ২৮ শতাংশের অংশ। ফলে দেশটির দাবানল শুধু স্থানীয় পরিবেশ নয়, বৃহত্তর জলবায়ু ও পরিবেশ ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ তৈরি করছে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে বড় প্রস্তুতি
দাবানল মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকার ৫ হাজার ৩০০-এর বেশি দমকলকর্মী মোতায়েনের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৩০০টি পানি ছোড়ার বিমান, হেলিকপ্টার ও মানুষ সরিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত বিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
দাবানল মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তাও আসছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে মেক্সিকো থেকে সর্বোচ্চ ২০০ জন দমকলকর্মী কানাডায় এসে কাজে যোগ দিতে পারেন।
পূর্বাঞ্চলে কিছুটা স্বস্তি
তবে কানাডার সব অঞ্চলের পরিস্থিতি একই রকম নয়। পূর্বাঞ্চলে আবহাওয়ার উন্নতির কারণে কুইবেকের কিছু দাবানল নিয়ন্ত্রণে এসেছে। প্রতিবেশী প্রদেশগুলোর পাশাপাশি ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের দমকলকর্মীরাও আগুন মোকাবিলায় সহায়তা করছেন।
কুইবেকের বন অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ সংস্থার কর্মকর্তা স্তেফান কারোঁ জানান, সেখানে পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে মাটির নিচে বা আগুনের এলাকায় কোনো উত্তপ্ত অংশ অবশিষ্ট আছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ বৃষ্টি না হলে এবং আবার তাপমাত্রা বেড়ে গেলে নিভে যাওয়া আগুনও নতুন করে জ্বলে উঠতে পারে।
কানাডার এবারের দাবানল তাই শুধু আগুন নেভানোর লড়াই নয়, বরং তাপমাত্রা বৃদ্ধি, শুষ্ক আবহাওয়া ও ঘন ঘন বজ্রপাতের কারণে বদলে যাওয়া পরিবেশগত বাস্তবতারও বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।
কানাডায় ভয়াবহ দাবানল ও বজ্রপাতের পর প্রায় ২৯ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে, হাজারো মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















