নির্বাচনকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন নিকারাগুয়ার সহ-প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগা। তাঁর এই বক্তব্য শুধু নিকারাগুয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ার চিত্রকেও নতুন করে সামনে এনেছে।
ওর্তেগা বলেছেন, নিকারাগুয়ায় আর কখনো নির্বাচন হবে না। তাঁর দাবি, বিরোধী দলগুলো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে। অথচ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্যই হলো জনগণের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করা।
নির্বাচন নিয়ে আর ভান করতে চান না ওর্তেগা
দীর্ঘদিন ধরে নিকারাগুয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা ক্রমেই একদলীয় শাসনের দিকে এগিয়েছে। বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করা এবং বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করার অভিযোগ রয়েছে ওর্তেগা সরকারের বিরুদ্ধে।
এতদিন অন্তত নির্বাচনের আয়োজন করে জনগণের সম্মতির একটি বাহ্যিক চিত্র ধরে রাখা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন আর হবে না—এমন ঘোষণা সেই মুখোশও সরিয়ে দিয়েছে।
রাজনীতিতে ভণ্ডামি সবসময় ভালো কিছু নয়। তবে কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা যখন নির্বাচন আয়োজনের ভান করে, তখন অন্তত তাদের নিজেদের ঘোষিত গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের কাছে জবাবদিহির সুযোগ থাকে। নির্বাচন থাকলে ক্ষমতাসীনদের ভুল করার এবং জনগণের কাছে পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনাও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না।
দুই দশকে গণতন্ত্রের বড় পতন
গত প্রায় দুই দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশে আগে তুলনামূলকভাবে স্বাধীন রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল, সেসব জায়গায় ক্ষমতাকেন্দ্রিক নেতারা ধীরে ধীরে সংবাদমাধ্যম, আদালত ও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছেন।
নিকারাগুয়া এই অবনতির অন্যতম স্পষ্ট উদাহরণ। একসময় জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসা ওর্তেগাই পরে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন, যেখানে তাঁকে চ্যালেঞ্জ করার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
দেশটির বহু মানুষ রাজনৈতিক চাপ ও অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বিরোধী রাজনীতিকদের কারাবন্দি করা, নির্বাসিত করা কিংবা নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও নিকারাগুয়ার রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও সংকুচিত করেছে।

ক্ষমতা ছাড়ার সুযোগ না থাকলে সংকট বাড়ে
নির্বাচন বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হয় ক্ষমতার উত্তরাধিকার। একজন নেতা যত দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকেন, শান্তিপূর্ণভাবে তাঁর কাছ থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্ন তত জটিল হয়ে ওঠে।
ওর্তেগার বয়স এখন ৮০ বছর। তাঁর দীর্ঘ শাসনের পর ক্ষমতা কার হাতে যাবে, তা নিয়েও নিকারাগুয়ায় প্রশ্ন রয়েছে। নিজের স্ত্রী রোসারিও মুরিয়ো এবং পরে পরিবারের অন্য সদস্যদের হাতে ক্ষমতা ধরে রাখার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
এ ধরনের পারিবারিক ক্ষমতার উত্তরাধিকার গণতন্ত্রের বদলে রাজনৈতিক বংশপরম্পরাকে শক্তিশালী করে। জনগণের ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার অধিকার তখন ক্রমেই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত
নিকারাগুয়ার ঘটনা শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ কোনো কর্তৃত্ববাদী সরকার যদি প্রকাশ্যে নির্বাচন বাতিল করে এবং তার জন্য বড় ধরনের আন্তর্জাতিক চাপের মুখে না পড়ে, তাহলে অন্য নেতারাও একই পথে হাঁটার সাহস পেতে পারেন।
এতদিন অনেক স্বৈরশাসক নির্বাচনকে নিজেদের ক্ষমতা বৈধ দেখানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করেছেন। নির্বাচন নিয়ন্ত্রিত হলেও তাঁরা অন্তত জনগণের ভোটের প্রতি আনুগত্যের অভিনয় করেছেন। সেই অভিনয়ও যদি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
ভোটের অধিকারই শেষ ভরসা
নির্বাচন পুরোপুরি নিখুঁত না হলেও তা ক্ষমতাসীনদের জন্য একটি অনিশ্চয়তা তৈরি করে। কখনো কখনো অসম রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেও জনগণের মতামত ফলাফল বদলে দিতে পারে। ইতিহাসে এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা নেতারা নির্বাচনের মাধ্যমে পরাজিত হয়েছেন।
তাই নির্বাচনকে শুধু ভোট দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর একটি।
নিকারাগুয়ার বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, কর্তৃত্ববাদী নেতারা যখন জনগণের কাছে জবাবদিহির প্রয়োজনটুকুও অস্বীকার করতে শুরু করেন, তখন বিপদ আরও গভীর হয়। গণতন্ত্র রক্ষার জন্য তাই সবচেয়ে মৌলিক অধিকার—নিজেদের শাসক নিজেরাই বেছে নেওয়ার অধিকার—ধরে রাখার দাবি আরও জোরালো করা জরুরি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















