চীনের হুনান প্রদেশের এক বাবা ১২ বছর বয়সী মেয়ের উচ্চতা বাড়াতে প্রতি মাসে প্রায় ৬ হাজার ইউয়ান, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ টাকা, খরচ করে বৃদ্ধিবর্ধক হরমোনের ইনজেকশন দিচ্ছেন। এ ঘটনা ঘিরে দেশটিতে শিশুদের উচ্চতা নিয়ে বাবা-মায়ের উদ্বেগ ও সামাজিক চাপ নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ছাংশা শহরের ওই বাবার পদবি লি। মেয়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধির হার বছরে মাত্র দুই থেকে তিন সেন্টিমিটার হওয়ায় তিনি চিকিৎসার মাধ্যমে তার উচ্চতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। চিকিৎসা শুরুর পর ছয় মাসে মেয়েটির উচ্চতা প্রায় চার সেন্টিমিটার বেড়েছে বলে জানা গেছে।
‘উচ্চতা জীবনে একবারই বাড়ানোর সুযোগ’
লি জানিয়েছেন, মেয়ের উচ্চতা নিয়ে তার নির্দিষ্ট প্রত্যাশা রয়েছে। বয়ঃসন্ধির পর শিশুদের স্বাভাবিক উচ্চতা বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার বিষয়টিও তাকে উদ্বিগ্ন করেছে।
তার ভাষ্য, উচ্চতা এমন একটি বিষয় যা পরে আর পরিবর্তন করা যায় না। তাই মেয়ের আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে এটিকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন।
তবে মেয়েটির বর্তমান উচ্চতা কত বা ভবিষ্যতে কোন পেশায় যেতে চায়, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। মেয়েটিও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।
চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা
শিশুদের উচ্চতা বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হরমোন চিকিৎসা সাধারণ কোনো সৌন্দর্যবর্ধক পদ্ধতি নয়। নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত সমস্যা শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শেই এ ধরনের ওষুধ ব্যবহারের কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা।
সাধারণত ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত এই চিকিৎসা চলতে পারে। শিশুর বয়স, হাড়ের বয়স ও বৃদ্ধির গতির ওপর ভিত্তি করে ইনজেকশনের মাত্রা ও সময় নির্ধারণ করা হয়।
চিকিৎসকদের মতে, মেয়েদের ক্ষেত্রে সাধারণত ১৪ বছর এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ১৬ বছর বয়সের কাছাকাছি হাড়ের বৃদ্ধির স্থান বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এরপর হরমোন প্রয়োগ করেও উচ্চতা বাড়ানো সম্ভব নয়।
বরং প্রয়োজন ছাড়া এমন চিকিৎসা নিলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট, রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়া, থাইরয়েডের সমস্যা কিংবা হাড়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাড়ের বৃদ্ধির স্থান আগেভাগে বন্ধ হয়ে গিয়ে উল্টো স্থায়ীভাবে উচ্চতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

উচ্চতা নিয়ে বাড়ছে সামাজিক চাপ
চীনে জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থার আওতায় দীর্ঘমেয়াদি বৃদ্ধিবর্ধক হরমোনের কিছু চিকিৎসা যুক্ত হওয়ার পর এর খরচও অনেক কমেছে। ফলে শিশুদের উচ্চতা বাড়ানোর চিকিৎসার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে বলে জানা গেছে।
এই প্রবণতা নিয়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। কেউ লির সিদ্ধান্তকে দায়িত্বশীল বাবার পরিচয় হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ভবিষ্যৎ পড়াশোনা, চাকরি কিংবা সামাজিক জীবনে বাড়তি উচ্চতা শিশুকে কিছুটা সুবিধা দিতে পারে।
অন্যদিকে অনেকেই মনে করছেন, বাবা-মায়ের অতিরিক্ত উচ্চতাকেন্দ্রিক চিন্তা শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ তৈরি করছে।
একদল মন্তব্যকারী বলছেন, শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির সময়ে নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম ও সুষম খাবার নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতির স্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় অযথা হস্তক্ষেপ করলে ভালো ফলের বদলে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
উচ্চতা কি সত্যিই সাফল্যের মাপকাঠি?
এই ঘটনাকে ঘিরে মূল প্রশ্নটি এখন শুধু একটি শিশুর উচ্চতা নিয়ে নয়। বরং সন্তানকে ‘আরও ভালো’ করে তোলার প্রতিযোগিতায় বাবা-মা কতটা এগিয়ে যেতে পারেন, সেটিও আলোচনায় এসেছে।
সন্তানের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে গিয়ে যদি তার স্বাভাবিক শরীর ও মানসিকতার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, তাহলে সেই বিনিয়োগ কতটা যৌক্তিক—এ প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।
শিশুর বেড়ে ওঠার সময়ে পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, খেলাধুলা ও সুস্থ জীবনযাপন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শই দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। উচ্চতা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে নিজের সিদ্ধান্তে কোনো হরমোন ব্যবহার না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
উচ্চতা বাড়াতে বাবার মাসে ৬ হাজার ইউয়ান খরচের ঘটনা তাই শুধু চীনের একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি সন্তানকে নিয়ে বাবা-মায়ের প্রত্যাশা, সামাজিক চাপ এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমারেখা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
চীনা শিশুর উচ্চতা বাড়াতে হরমোন চিকিৎসা নিয়ে বাবার সিদ্ধান্ত ঘিরে সামাজিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, প্রয়োজন ছাড়া এমন চিকিৎসা ঝুঁকিপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















