হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইরানের ছোড়া ড্রোন ভূপাতিত করার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর জেরে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর দাবি, ইরান হরমুজ প্রণালির দিকে চারটি ড্রোন পাঠিয়েছিল, যেগুলো আঞ্চলিক সামুদ্রিক চলাচলকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এসব ড্রোন ভূপাতিত করার পর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের গোরুক ও কেশম দ্বীপের নজরদারি ও রাডার স্থাপনায় হামলা চালায়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলাকে গত ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে। তেহরানের ভাষ্য, ওয়াশিংটন উত্তেজনা কমানোর কোনো ইচ্ছা দেখাচ্ছে না এবং এর পরিণতির দায় যুক্তরাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।
কুয়েত ও বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
মার্কিন হামলার জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে। একই সঙ্গে অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা চারটি তেলবাহী জাহাজেও হামলার কথা জানিয়েছে তারা।
কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সাতটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল। সেগুলোর কারণে কিছু স্থাপনার ক্ষতি হলেও কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। বাহরাইনেও সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয় এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর দাবি, ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে ছয়টি প্রতিহত করা হয়েছে এবং একটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেনি।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত
তিন মাস ধরে চলা এই সংঘাত থামাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছে। একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি।
ইরান চায় তেল বিক্রির আয় ব্যবহারের সুযোগ, জ্বালানি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব বজায় রাখার নিশ্চয়তা। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে চলাচল সীমিত করে রেখেছে, যার মাধ্যমে আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হতো।
এদিকে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি তেহরানের পথে রয়েছেন বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। পাকিস্তান সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে এবং নাকভি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দিতে পারেন বলে জানা গেছে।
ট্রাম্পের মন্তব্য ও অভ্যন্তরীণ চাপ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের অধিকাংশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস করা হলেও দেশটির হাতে এখনো প্রায় ২১ থেকে ২২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে ট্রাম্প নিজ দেশেও রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। চলমান সংঘাত বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়েছে এবং বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করেছে, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ খাদ্যসংকটের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
লেবানন ইস্যুতেও অচলাবস্থা
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির জন্য লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার প্রয়োজন।
এদিকে দক্ষিণ লেবাননে একটি সামরিক যানবাহনে ইসরায়েলি হামলায় দুই সেনা কর্মকর্তা ও এক সেনা নিহত হয়েছেন বলে লেবাননের সেনাবাহিনী জানিয়েছে। ইসরায়েল বলেছে, তাদের বাহিনীর জন্য সম্ভাব্য হুমকির তথ্য পাওয়ার পর ওই হামলা চালানো হয়।
হিজবুল্লাহ নেতা নাইম কাসেম সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত সমঝোতা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ, এতে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না এবং আলোচনায় হিজবুল্লাহও অংশ নেয়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















