খুলনা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং একটি বিস্তৃত অপরাধ অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠেছে। নদীর ঘাট, রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকা, শ্রমজীবী মানুষের বসতি এবং বিভিন্ন জনবহুল স্থানে মাদক সহজলভ্য হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকাশ্যেই মাদক কেনাবেচা ও সেবন চললেও এর মূল হোতারা অধিকাংশ সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
শতাধিক এলাকায় মাদকের বিস্তার
নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের মতে, শুধু একটি বা দুটি জায়গা নয়, বরং শতাধিক স্থানে মাদকের বিস্তার ঘটেছে। ছোট ছোট অস্থায়ী ঘর, দোকান কিংবা গোপন আস্তানাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে খুচরা বিক্রির নেটওয়ার্ক। প্রশাসনের কাছে মাদক কারবারিদের তালিকা থাকলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের সম্পর্কে স্থানীয়দের অভিযোগ, কারা সরবরাহ করে, কারা বিক্রি করে এবং কোন এলাকায় কার প্রভাব—এসব তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই পরিচিত। কিন্তু আইনগত ব্যবস্থার মুখোমুখি হন মূলত বাহক, খুচরা বিক্রেতা ও ভোক্তারা।
অপরাধ অর্থনীতির জ্বালানি
মাদক ব্যবসা থেকে দ্রুত অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকায় নিম্ন আয়ের অনেক মানুষও এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পরিচালনা, প্রভাব বিস্তার, মামলা মোকাবিলা এবং বিভিন্ন ধরনের অবৈধ নেটওয়ার্ক সচল রাখতে। ফলে মাদক শুধু একটি নেশাজাতীয় দ্রব্য নয়, অপরাধচক্রের আর্থিক ভিত্তিতেও পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকের অর্থ, অপরাধী গোষ্ঠীর শক্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাব একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে একটি জটিল কাঠামো তৈরি করেছে।
ধরা পড়ে বাহক, রয়ে যায় নিয়ন্ত্রক
মাদকবিরোধী অভিযানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবহনের সময় মাদক জব্দ হচ্ছে। বড় চালান দ্রুত ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ায় মূল নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যায়। আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহের কারণে প্রচলিত অভিযানের কার্যকারিতাও কমে গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক প্রভাব, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে অনেক নিয়ন্ত্রক আড়ালে থেকে ব্যবসা পরিচালনা করে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন মহলে অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু সদস্যের সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ রয়েছে। পাশাপাশি অভিযানের তথ্য ফাঁস, অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া এবং মাঠপর্যায়ে দুর্বলতার অভিযোগও সামনে এসেছে।
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হামলা এবং অভিযানে বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, যা মাদকচক্রের সংগঠিত শক্তির ইঙ্গিত দেয়।
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়াও বড় বাধা
মাদকসংক্রান্ত বিপুলসংখ্যক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় অভিযুক্তদের অনেকেই জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তদন্তের সীমাবদ্ধতা, সাক্ষ্যপ্রমাণের দুর্বলতা এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া মাদক নিয়ন্ত্রণের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
মাদক, অপরাধ ও প্রভাবশালী মহলের ত্রিভুজ
পর্যবেক্ষকদের মতে, মাদক ব্যবসাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। মাদকের অর্থ অপরাধী গোষ্ঠীকে শক্তিশালী করে, অপরাধী গোষ্ঠী এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, আর প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় সেই শক্তিকে আরও টেকসই করে তোলে। ফলে একটি ত্রিভুজ তৈরি হয়েছে, যেখানে মাদক, অপরাধ ও প্রভাব একে অপরকে শক্তিশালী করছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, মূল অর্থদাতা, নিয়ন্ত্রক ও পৃষ্ঠপোষকদের জবাবদিহির আওতায় আনা না গেলে মাদককে ঘিরে সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও অপরাধের চক্র ভাঙা কঠিন হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















