সৌন্দর্যচর্চার বাজার দ্রুত বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বোটক্স, ফিলার, লেজার বা বিভিন্ন ইনজেকশনভিত্তিক চিকিৎসাকে অনেক সময় সহজ ও নিরাপদ বলে তুলে ধরা হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রক্রিয়া আসলে চিকিৎসা পদ্ধতির অংশ এবং সেগুলো প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া করানো গুরুতর ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
সম্প্রতি ওষুধ নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে যে ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া কোনো প্রস্তুতি প্রসাধনী পণ্যের আওতায় পড়ে না। এই ব্যাখ্যাকে স্বাগত জানিয়েছেন চর্মরোগ ও সৌন্দর্য চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এর ফলে সৌন্দর্যসেবা ও চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য আরও পরিষ্কার হবে।
চিকিৎসা ছাড়া চিকিৎসা নয়
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সেলুন বা অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানে করা ইনজেকশনভিত্তিক চিকিৎসার পর অনেক রোগী সংক্রমণ, ফোলা, ত্বকে গুটি, চোখের পাতা ঝুলে যাওয়া কিংবা মুখের অসমতা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসছেন। অনেক ক্ষেত্রে জীবাণুমুক্ত পরিবেশ ও নিরাপত্তা বিধি ঠিকমতো মানা হয় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব চিকিৎসা যতই সহজ মনে হোক না কেন, এগুলো শরীরের ভেতরে হস্তক্ষেপ করে। ফলে অন্য যেকোনো চিকিৎসার মতোই সতর্কতা ও দক্ষতা প্রয়োজন।
ওয়েলনেস ক্লিনিকের বাড়বাড়ন্ত
দেশজুড়ে ওয়েলনেস ক্লিনিক, বিউটি স্টুডিও ও সেলুনের সংখ্যা বাড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই প্লেটলেটসমৃদ্ধ রক্তচিকিৎসা, কোষ পুনর্জন্মভিত্তিক থেরাপি, মেসোথেরাপি কিংবা ভিটামিনসমৃদ্ধ শিরায় তরল দেওয়ার মতো সেবা দিচ্ছে।
চিকিৎসকদের অভিযোগ, অনেক প্রতিষ্ঠানে এসব সেবার জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রোটোকল অনুসরণ করা হয় না। কোথাও কোথাও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়াই কর্মীরা এসব কাজ করছেন। এতে রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
একজন ভুক্তভোগী জানান, বিয়ের আগে ত্বকের উজ্জ্বলতা ও ওজন নিয়ন্ত্রণের আশায় তিনি একাধিক শিরায় তরল গ্রহণ করেছিলেন। পরে তার শারীরিক জটিলতা দেখা দেয় এবং দীর্ঘ সময় চিকিৎসা নিতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর প্রকৃত প্রয়োজন যাচাই না করেই এসব সেবা দেওয়া হয়।

সংক্রমণ ও গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা
যেসব চিকিৎসায় রক্ত সংগ্রহ বা ইনজেকশন ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ নিয়ম না মানলে সংক্রামক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। একই সঙ্গে সংক্রমণ, ফোঁড়া, ত্বকের ক্ষতি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তসংক্রান্ত যেকোনো প্রক্রিয়ার জন্য সঠিক নথি সংরক্ষণ, যন্ত্রপাতি পরীক্ষা এবং জীবাণুমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
লেজার চিকিৎসাতেও সতর্কতা প্রয়োজন
লেজার হেয়ার রিমুভালকে অনেকেই সাধারণ সৌন্দর্যসেবা মনে করেন। কিন্তু চিকিৎসকদের ভাষ্য, এটি অত্যন্ত দক্ষতানির্ভর একটি প্রক্রিয়া। ভুল পদ্ধতিতে করা হলে ত্বকে পোড়া দাগ, রঙের পরিবর্তন কিংবা স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় ত্বকে লেজারের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে। তাই রোগীর ত্বকের ধরন মূল্যায়ন করে চিকিৎসা পরিকল্পনা করা জরুরি। শুধুমাত্র যন্ত্র চালাতে জানা যথেষ্ট নয়; জটিলতা শনাক্ত ও মোকাবিলার জন্য চিকিৎসাবিষয়ক জ্ঞানও প্রয়োজন।
কোন সেবা নিরাপদ?
চিকিৎসকদের মতে, সাধারণ পরিচর্যামূলক সেবা যেমন চুল কাটা, ওয়াক্সিং, ম্যানিকিউর, পেডিকিউর বা তেল মালিশ সেলুনে নিরাপদভাবে করা যায়। তবে ইনজেকশন, লেজার, রাসায়নিক পিলিং বা রক্তভিত্তিক চিকিৎসা অবশ্যই অনুমোদিত চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, কোনো চিকিৎসা নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং ব্যবহৃত উপকরণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। অবাস্তব প্রতিশ্রুতি বা অস্বাভাবিক কম খরচের প্রলোভন এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















