চীনের শহরগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার মোটরসাইকেলে ছুটে চলা ডেলিভারি কর্মীরা আধুনিক নগরজীবনের অপরিহার্য অংশ। খাবার, ওষুধ, পোশাক থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। কিন্তু এই কর্মীদের জীবন দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। সরকার নতুন শ্রমনীতি চালু করলেও বাস্তবে তাদের আয়, নিরাপত্তা এবং কর্মপরিবেশে খুব বেশি উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।
বেইজিংয়ের উপকণ্ঠে বসবাসকারী বহু ডেলিভারি কর্মী বলছেন, কয়েক বছর আগেও এই পেশায় তুলনামূলক ভালো আয় ছিল। কারখানার চাকরির চেয়ে বেশি উপার্জনের সুযোগ থাকায় অনেকেই এই খাতে এসেছিলেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ায় আরও বেশি মানুষ খণ্ডকালীন বা অস্থায়ী কাজের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে প্রতিযোগিতা বেড়েছে এবং প্রতি ডেলিভারিতে পাওয়া পারিশ্রমিক কমে গেছে।
আয় কমছে, খরচ বাড়ছে
অনেক কর্মীর অভিযোগ, আগে একটি ডেলিভারির জন্য যে পরিমাণ অর্থ পাওয়া যেত, এখন তার তুলনায় অনেক কম আয় হচ্ছে। বাসাভাড়া, খাবার এবং দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর পর হাতে প্রায় কিছুই থাকে না। ফলে দীর্ঘ সময় কাজ করেও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

চীনের বিভিন্ন শহরে ডেলিভারি কর্মীদের বড় অংশই দেশের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র অঞ্চল থেকে আসা অভিবাসী শ্রমিক। তারা কম খরচের ছোট কক্ষে থাকেন এবং প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কাজ করেন। অনেকের জন্য এই পেশাই এখন শেষ ভরসা।
ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ
ডেলিভারি কর্মীদের দৈনন্দিন জীবন শুধু আর্থিক চাপে নয়, নিরাপত্তা ঝুঁকিতেও ভরা। সময়মতো পণ্য পৌঁছে দিতে না পারলে আয় কমে যায় বা জরিমানা দিতে হয়। তাই তারা প্রায়ই ব্যস্ত সড়কে দ্রুতগতিতে চলাচল করেন।
অনেক কর্মী দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেন। দুর্ঘটনা তাদের কাছে প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। তবুও কাজ বন্ধ করার সুযোগ নেই। কারণ উপার্জন না থাকলে জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রযুক্তির চাপ ও সীমিত অধিকার
ডেলিভারি খাতের বড় একটি সমস্যা হলো স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারনির্ভর কাজের ব্যবস্থা। কোন কর্মী কত অর্ডার পাবেন, কত দ্রুত ডেলিভারি করতে হবে এবং কর্মক্ষমতার মূল্যায়ন কীভাবে হবে—এসবই নির্ধারিত হয় ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে।
একই সঙ্গে অনেক কর্মী সরাসরি বড় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী নন। তারা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন বা কর্মস্থল দুর্ঘটনার সুরক্ষার মতো সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী কাজ করতে গিয়ে আহত হয়েছেন, অথচ তাদের বেশিরভাগেরই পর্যাপ্ত বীমা নেই।
নতুন নিয়ম, পুরোনো সমস্যা
সরকার কয়েক বছর আগে ডেলিভারি কর্মীদের সুরক্ষার জন্য কিছু নীতি চালু করে। সেখানে ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা এবং অমানবিক কাজের চাপ কমানোর কথা বলা হয়েছিল। সম্প্রতি আবারও খণ্ডকালীন ও অস্থায়ী কর্মীদের জন্য নতুন শ্রমবিধি ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে কর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে খুব বেশি আশাবাদ নেই। তাদের মতে, আগের নিয়মগুলোরও যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে নতুন ঘোষণাগুলো বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা বড় বাধা

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল কারণ শুধু কর্মপরিবেশ নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। স্থায়ী চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ায় আরও বেশি মানুষ ডেলিভারি খাতে প্রবেশ করছেন। এতে শ্রমের জোগান বাড়ছে এবং মজুরির ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
এ ছাড়া অনেক অভিবাসী শ্রমিক যে শহরে কাজ করেন, সেখানে পূর্ণ নাগরিক সুবিধা পান না। ফলে স্বাস্থ্যসেবা, বেকার ভাতা কিংবা অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাও সীমিত থাকে।
চীনের শহরগুলো সচল রাখতে ডেলিভারি কর্মীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাদের জীবনের বাস্তবতা দেখাচ্ছে, নতুন নিয়মের ঘোষণার চেয়ে কার্যকর বাস্তবায়ন এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক উন্নয়নই তাদের জন্য প্রকৃত পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে। আপাতত অনেকের কাছে কঠোর পরিশ্রমের বিকল্প নেই, আর আগামী দিনের আশাও অনিশ্চিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















