ইউএনবি
আগামী ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে নতুন সরকারের সামনে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা রয়েছে, তা বাস্তবায়নের পথে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
তাদের মতে, আগের প্রশাসনের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া দুর্বল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলো দেশের অর্থায়ন ব্যবস্থাকে ক্রমেই কঠিন অবস্থায় ঠেলে দিচ্ছে। ফলে আসন্ন বাজেট বাস্তবায়ন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি
বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান উৎস রাজস্ব আদায়। কিন্তু চলতি অর্থবছরে এই খাতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে শেষ দুই মাসে ১২৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে, যা বাস্তবে সম্ভব নয় বলেই মনে হচ্ছে।
বাংলাদেশে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনও ৮ শতাংশের নিচে, যা এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
খেলাপি ঋণে বিপর্যস্ত ব্যাংক খাত
স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া দীর্ঘদিন ধরে সরকারের অন্যতম প্রধান অর্থায়নের উৎস। কিন্তু ব্যাংক খাতের বর্তমান দুর্বলতা এই পথকেও সংকুচিত করে ফেলেছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, দীর্ঘদিনের দুর্বল শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বারবার ঋণ পুনঃতফসিলের কারণে খেলাপি ঋণের হার ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে এ হার ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ।

বিপুল পরিমাণ অর্থ খেলাপি ঋণে আটকে থাকায় ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে ভুগছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, সরকারের অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ ঋণগ্রহণ বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে, যার ফলে ব্যবসা ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিনিয়োগে স্থবিরতা ও কমছে বিদেশি বিনিয়োগ
নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ভাটা পড়েছে।
বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) এখনও সন্তোষজনক নয়। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এ অবস্থার মধ্যে ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের বিষয়টি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এলডিসি উত্তরণের পর তৈরি পোশাক খাত আন্তর্জাতিক বাজারে যে বিশেষ শুল্ক সুবিধা পায়, তার একটি বড় অংশ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ দ্রুত না বাড়লে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অর্থায়ন কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও জ্বালানির উচ্চ ব্যয়
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে।

ফলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে স্বাভাবিক দামের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি ব্যয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বিদ্যুৎ ও এলএনজি খাতে ভর্তুকির জন্য আসন্ন বাজেটে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
যদিও ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়ানো হয়েছে, তবুও উচ্চ জ্বালানি ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য উপলব্ধ অর্থ কমিয়ে দিচ্ছে।
কর্মসংস্থান সংকট ও বাড়ছে দারিদ্র্য
অর্থনৈতিক মন্থরতার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানে।
প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে প্রায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যার ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সীমিত হয়ে পড়েছে।

একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে থাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমছে।
জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে পরিবার কার্ডভিত্তিক নগদ সহায়তাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়াতে হচ্ছে, যা সরকারি ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ
অর্থনীতিবিদদের মতে, অতীতের মতো শুধু ব্যাংকঋণ বা অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহের মাধ্যমে বাজেটের অর্থায়ন করা এখন আর কার্যকর সমাধান নয়।
তারা বলছেন, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে হলে ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা, অপচয় কমানো, রাজস্ব ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার আনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
১১ জুনের বাজেটকে তাই শুধু বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই পথে ফেরানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরীক্ষা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
Sarakhon Report 



















