রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ‘তথ্যগতভাবে ভুল’ আখ্যা দিয়ে এর প্রতিবাদ জানাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মঙ্গলবার ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াও সোয়ে মো-কে ডেকে দেশটির বক্তব্যের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা হবে।
মঙ্গলবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালকের সঙ্গে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার ইতিহাস ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মিয়ানমারের বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক
১৫ আগস্ট মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন দাবি করা হয়। দেশটি জানায়, বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের নাম পাঠিয়েছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের নাম যাচাই করা হয়েছে বলে দাবি করে মিয়ানমার।
দেশটির দাবি অনুযায়ী, যাচাইয়ে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনের রাখাইন রাজ্যে বসবাসের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ৪ হাজার ২৪১ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের রাখাইনে বসবাসের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মিয়ানমার আরও দাবি করেছে, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। একই সঙ্গে উত্তর রাখাইনে আরও ২ লাখের বেশি মানুষ রয়ে গেছে বলেও দাবি করেছে দেশটি।

রোহিঙ্গাদের তীব্র প্রত্যাখ্যান
মিয়ানমারের এই বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর ও ইতিহাস বিকৃতির প্রচেষ্টা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা। সংগঠনটির দাবি, রোহিঙ্গাদের পরিচয় অস্বীকার করে তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করা দীর্ঘদিনের নিপীড়নের অন্যতম ভিত্তি।
তাদের ভাষ্য, রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যের স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং তাদের দীর্ঘ ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রয়েছে। নাগরিকত্ব ও অধিকার অস্বীকারের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত যেকোনো নামকরণ তারা প্রত্যাখ্যান করে।
সংগঠনটি আরও বলেছে, রোহিঙ্গাদের দুর্দশার জন্য আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মিকে দায়ী করা বাস্তবতাকে উল্টোভাবে উপস্থাপন করা। তাদের দাবি, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা নিয়েও বিরোধ
রোহিঙ্গা সংগঠনটির দাবি, ২০১৭ সালের সহিংসতার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে ১৯৯১-৯২ সালের নিপীড়নের সময় আরও ২ লাখের বেশি মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। ফলে বর্তমানে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখের বেশি বলে তারা উল্লেখ করেছে।
রাখাইনে থাকা রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতিও স্বাভাবিক নয় বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। তাদের মতে, সেখানে থাকা অনেকেই শিবিরে কার্যত বন্দি, চলাচলের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত এবং মৌলিক অধিকারহীন অবস্থায় রয়েছে।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনিশ্চিত
২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই বছরের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগে সম্মত হয়েছিল। তবে ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। দেশটিতে সশস্ত্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
এরপর ২০২৩ সাল থেকে রাখাইনভিত্তিক আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ নতুন করে পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। লড়াইয়ের মধ্যে রাখাইনের বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও মানুষ প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দিকে পালিয়ে যায়। বর্তমানে রাখাইনের বড় একটি অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
মিয়ানমার জানিয়েছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে যাচাই করা সাবেক বাসিন্দাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে। তবে সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক, প্রত্যাবাসন ও রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে এই বিষয়টি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















