০৫:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
সবার জন্য রেলসেবা: প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিতের আহ্বান দাবায়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে মিসরের কড়া জবাব, ‘প্রতিবেদনে বাস্তবতা বিকৃত’ প্রযুক্তির পর্দায় যুদ্ধের স্মৃতি: ইতিহাস কি অভিজ্ঞতা, নাকি পণ্য? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আকাশের ‘দাগ’ এড়িয়ে উড়বে বিমান, কমতে পারে জলবায়ু উষ্ণতা হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ ইমরান খানকে, সুপ্রিম কোর্টের আদেশ বিশ্বে মাত্র ৪০ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে রয়েছে মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধা ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের পথে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ, প্রত্যাশার আগেই বাড়ছে ঋণের বোঝা জাতিগণনা নিয়ে মোদি সরকারকে নিশানা, ২০২৭ সালের জনগণনায় ‘কারসাজির’ অভিযোগ কংগ্রেসের গোপালগঞ্জে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ২৫ ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প-ভ্যান্স দ্বন্দ্ব, গ্যাসের দামেই চাপ রিপাবলিকান শিবিরে

পারমাণবিক বোমার জন্মের মধ্যেই ছিল তার ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা

১৯৪৫ সালের আগস্টের সেই সকালগুলোর কথা ভাবলে ইতিহাসের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের সিদ্ধান্তটি কি অন্যভাবে নেওয়া যেত? যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার যুক্তির বাইরে কি এমন কোনো পথ ছিল, যেখানে নতুন এই ভয়াবহ অস্ত্রের শক্তি প্রদর্শন করা যেত, কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন ধ্বংস করতে হতো না?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে ‘ফ্র্যাঙ্ক রিপোর্ট’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন ম্যানহাটন প্রকল্পে কাজ করা কয়েকজন বিজ্ঞানীই এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। তাঁদের যুক্তি শুধু মানবিক বিবেচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁরা ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য সংকটও দেখতে পেয়েছিলেন।

বিজ্ঞানীর দায়িত্ব কোথায়

১৯৪৫ সালের জুনে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে গঠিত বিজ্ঞানীদের একটি কমিটি প্রতিবেদনটি তৈরি করে। নেতৃত্বে ছিলেন নোবেলজয়ী পদার্থবিদ জেমস ফ্র্যাঙ্ক। মোট সাত বিজ্ঞানীর মতামত এতে প্রতিফলিত হয়।

প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—জাপানের কোনো শহরের ওপর পারমাণবিক বোমা ফেলা উচিত হবে না। বরং একটি নিরপেক্ষ ও জনবসতিহীন এলাকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সামনে অস্ত্রটির শক্তি প্রদর্শনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

তাঁদের আশঙ্কা ছিল, প্রথম পারমাণবিক হামলা শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানিই ঘটাবে না; এটি বিশ্ব রাজনীতিতে এমন একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করবে, যার পরিণতি হবে আরও ভয়াবহ।

ফ্র্যাঙ্কের ব্যক্তিগত ইতিহাসও তাঁর অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। জার্মান ইহুদি পরিবারে জন্ম নেওয়া এই বিজ্ঞানী প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী জীবনে সেই অভিজ্ঞতা তাঁর মধ্যে গভীর অনুশোচনা তৈরি করেছিল বলে তাঁর পরিবারের সদস্যদের বর্ণনায় উঠে আসে।

হিটলার ক্ষমতায় আসার পর নাৎসিদের ইহুদিবিদ্বেষী নীতির প্রতিবাদে তিনি জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। পরে ম্যানহাটন প্রকল্পে যোগ দিলেও তিনি একটি শর্ত রেখেছিলেন—পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের প্রশ্ন উঠলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজের মত জানানোর সুযোগ তাঁকে দিতে হবে।

এখানেই বিজ্ঞানীর বিবেকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়। রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করা এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা এক বিষয় নয়। বৈজ্ঞানিক জ্ঞান মানুষের জন্য নতুন ক্ষমতা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার হবে—সে প্রশ্নে বিজ্ঞানীর নৈতিক দায়িত্বও রয়েছে।

শুধু প্রাণহানি নয়, ভবিষ্যৎ নিয়েও আশঙ্কা

ফ্র্যাঙ্ক ও তাঁর সহকর্মীদের আপত্তির কেন্দ্রে ছিল নির্বিচার ধ্বংসের আশঙ্কা। টোকিও, নাগোয়া, ওসাকা ও কোবের মতো জাপানের বড় শহরগুলো ইতোমধ্যেই প্রচলিত বোমা হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাঁদের চোখে পারমাণবিক অস্ত্র ছিল বেসামরিক মানুষের ওপর ব্যাপক ও নির্বিচার ধ্বংস ডেকে আনার নতুন উপায়।

তবে তাঁদের উদ্বেগ আরও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

তাঁরা আশঙ্কা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রথমে এই অস্ত্র ব্যবহার করে, তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়নও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে। এর পরিণতি হতে পারে নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা। পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য যে আন্তর্জাতিক সমঝোতার প্রয়োজন ছিল, প্রথম হামলাই সেই সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

পরবর্তী ইতিহাস তাঁদের আশঙ্কার অনেকটাই সত্য প্রমাণ করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে এবং পরে হাইড্রোজেন বোমাও তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শুরু হয় দীর্ঘ ও বিপজ্জনক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা।

অর্থাৎ ফ্র্যাঙ্ক রিপোর্ট শুধু একটি যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্তের সমালোচনা ছিল না। এটি ছিল যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বের সম্ভাব্য নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে বিজ্ঞানীদের একটি প্রাথমিক রাজনৈতিক ও নৈতিক সতর্কবার্তা।

The Atomic Bombings | The National WWII Museum | New Orleans

একটি হারানো সম্ভাবনার ইতিহাস

যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন শেষ পর্যন্ত ফ্র্যাঙ্ক রিপোর্টের সুপারিশ গ্রহণ করেনি। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমা এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়।

আজ, আট দশক পর দাঁড়িয়ে ইতিহাসের সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘যদি’ প্রশ্ন তোলা সহজ নয়। যুদ্ধের তৎকালীন বাস্তবতা, জাপানের আত্মসমর্পণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হিসাব—সবকিছুই সেই সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করেছিল। কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক রিপোর্ট অন্তত এটুকু প্রমাণ করে যে তখনও বিকল্প চিন্তা ছিল। এমনকি যে বিজ্ঞানীরা অস্ত্রটি তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ বুঝতে পেরেছিলেন—একবার পারমাণবিক অস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলে মানবজাতি এমন এক যুগে প্রবেশ করবে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন।

এই কারণেই রিপোর্টটির গুরুত্ব শুধু ১৯৪৫ সালে সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধের পর ম্যানহাটন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বিজ্ঞানী মনে করেছিলেন, তাঁরা যে অস্ত্র তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন, সেটির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের জন্য তাঁদেরই সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। বিজ্ঞানীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা সংগঠনগুলো পরে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও বিস্তার রোধের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

ফ্র্যাঙ্কের নাতি ফ্র্যাঙ্ক ভন হিপেলও পরবর্তী জীবনে একই ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনায় অংশ নিয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে মার্কিন প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা নীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

এটি এক ধরনের প্রজন্মান্তরের উত্তরাধিকার। একজন বিজ্ঞানী যে প্রশ্নটি যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে তুলেছিলেন, পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞানীরা সেটিকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদি আলোচনায় পরিণত করেছেন।

আজকের পৃথিবীর জন্য শিক্ষা

বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে আলোচনা আবারও নিরাপত্তা, প্রতিরোধক্ষমতা ও সামরিক শক্তির প্রশ্নে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ছে, রাষ্ট্রগুলো নিজেদের পারমাণবিক সক্ষমতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলছে। এমন পরিস্থিতিতে অস্ত্রের সামরিক কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা স্বাভাবিক।

কিন্তু এই আলোচনায় একটি মৌলিক প্রশ্ন হারিয়ে গেলে বিপদ আরও বাড়বে—কোনো অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব বলেই কি সেটি ব্যবহার করা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য?

ফ্র্যাঙ্ক রিপোর্টের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই। পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা শুধু তার বিস্ফোরণের শক্তিতে নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বেসামরিক মানুষের জীবন, আন্তর্জাতিক আস্থার সংকট এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি।

যে বিজ্ঞানীরা বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রকল্পে কাজ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যেই কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত সতর্ক করেছিলেন—মানবজাতির ওপর এই নতুন ধ্বংসক্ষমতার প্রথম ব্যবহারই ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

আট দশক পর সেই সতর্কবার্তার গুরুত্ব কমেনি। বরং পারমাণবিক অস্ত্র যত বেশি রাষ্ট্রের হাতে ছড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক যত বেশি অনিশ্চিত হয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে যে বিজ্ঞান ও সামরিক শক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি নৈতিক দায়িত্ব, আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক সংযমও সমান জরুরি।

ইতিহাস বদলানো যায় না। কিন্তু ইতিহাস থেকে কোন শিক্ষা নেওয়া হবে, সেটি বর্তমানের সিদ্ধান্ত। ফ্র্যাঙ্ক রিপোর্ট সেই সিদ্ধান্তের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে যায়—মানবজাতি কি তার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রের মালিক হতে চায়, নাকি সেই অস্ত্রের ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করার মতো যথেষ্ট দায়িত্বশীলও হতে চায়?

জনপ্রিয় সংবাদ

সবার জন্য রেলসেবা: প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিতের আহ্বান

পারমাণবিক বোমার জন্মের মধ্যেই ছিল তার ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা

০৪:৪৩:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

১৯৪৫ সালের আগস্টের সেই সকালগুলোর কথা ভাবলে ইতিহাসের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের সিদ্ধান্তটি কি অন্যভাবে নেওয়া যেত? যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার যুক্তির বাইরে কি এমন কোনো পথ ছিল, যেখানে নতুন এই ভয়াবহ অস্ত্রের শক্তি প্রদর্শন করা যেত, কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন ধ্বংস করতে হতো না?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে ‘ফ্র্যাঙ্ক রিপোর্ট’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন ম্যানহাটন প্রকল্পে কাজ করা কয়েকজন বিজ্ঞানীই এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। তাঁদের যুক্তি শুধু মানবিক বিবেচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁরা ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য সংকটও দেখতে পেয়েছিলেন।

বিজ্ঞানীর দায়িত্ব কোথায়

১৯৪৫ সালের জুনে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে গঠিত বিজ্ঞানীদের একটি কমিটি প্রতিবেদনটি তৈরি করে। নেতৃত্বে ছিলেন নোবেলজয়ী পদার্থবিদ জেমস ফ্র্যাঙ্ক। মোট সাত বিজ্ঞানীর মতামত এতে প্রতিফলিত হয়।

প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—জাপানের কোনো শহরের ওপর পারমাণবিক বোমা ফেলা উচিত হবে না। বরং একটি নিরপেক্ষ ও জনবসতিহীন এলাকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সামনে অস্ত্রটির শক্তি প্রদর্শনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

তাঁদের আশঙ্কা ছিল, প্রথম পারমাণবিক হামলা শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানিই ঘটাবে না; এটি বিশ্ব রাজনীতিতে এমন একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করবে, যার পরিণতি হবে আরও ভয়াবহ।

ফ্র্যাঙ্কের ব্যক্তিগত ইতিহাসও তাঁর অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। জার্মান ইহুদি পরিবারে জন্ম নেওয়া এই বিজ্ঞানী প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী জীবনে সেই অভিজ্ঞতা তাঁর মধ্যে গভীর অনুশোচনা তৈরি করেছিল বলে তাঁর পরিবারের সদস্যদের বর্ণনায় উঠে আসে।

হিটলার ক্ষমতায় আসার পর নাৎসিদের ইহুদিবিদ্বেষী নীতির প্রতিবাদে তিনি জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। পরে ম্যানহাটন প্রকল্পে যোগ দিলেও তিনি একটি শর্ত রেখেছিলেন—পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের প্রশ্ন উঠলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজের মত জানানোর সুযোগ তাঁকে দিতে হবে।

এখানেই বিজ্ঞানীর বিবেকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়। রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করা এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা এক বিষয় নয়। বৈজ্ঞানিক জ্ঞান মানুষের জন্য নতুন ক্ষমতা তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার হবে—সে প্রশ্নে বিজ্ঞানীর নৈতিক দায়িত্বও রয়েছে।

শুধু প্রাণহানি নয়, ভবিষ্যৎ নিয়েও আশঙ্কা

ফ্র্যাঙ্ক ও তাঁর সহকর্মীদের আপত্তির কেন্দ্রে ছিল নির্বিচার ধ্বংসের আশঙ্কা। টোকিও, নাগোয়া, ওসাকা ও কোবের মতো জাপানের বড় শহরগুলো ইতোমধ্যেই প্রচলিত বোমা হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাঁদের চোখে পারমাণবিক অস্ত্র ছিল বেসামরিক মানুষের ওপর ব্যাপক ও নির্বিচার ধ্বংস ডেকে আনার নতুন উপায়।

তবে তাঁদের উদ্বেগ আরও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

তাঁরা আশঙ্কা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রথমে এই অস্ত্র ব্যবহার করে, তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়নও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে। এর পরিণতি হতে পারে নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা। পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য যে আন্তর্জাতিক সমঝোতার প্রয়োজন ছিল, প্রথম হামলাই সেই সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

পরবর্তী ইতিহাস তাঁদের আশঙ্কার অনেকটাই সত্য প্রমাণ করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে এবং পরে হাইড্রোজেন বোমাও তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শুরু হয় দীর্ঘ ও বিপজ্জনক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা।

অর্থাৎ ফ্র্যাঙ্ক রিপোর্ট শুধু একটি যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্তের সমালোচনা ছিল না। এটি ছিল যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বের সম্ভাব্য নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে বিজ্ঞানীদের একটি প্রাথমিক রাজনৈতিক ও নৈতিক সতর্কবার্তা।

The Atomic Bombings | The National WWII Museum | New Orleans

একটি হারানো সম্ভাবনার ইতিহাস

যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন শেষ পর্যন্ত ফ্র্যাঙ্ক রিপোর্টের সুপারিশ গ্রহণ করেনি। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমা এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়।

আজ, আট দশক পর দাঁড়িয়ে ইতিহাসের সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘যদি’ প্রশ্ন তোলা সহজ নয়। যুদ্ধের তৎকালীন বাস্তবতা, জাপানের আত্মসমর্পণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হিসাব—সবকিছুই সেই সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করেছিল। কিন্তু ফ্র্যাঙ্ক রিপোর্ট অন্তত এটুকু প্রমাণ করে যে তখনও বিকল্প চিন্তা ছিল। এমনকি যে বিজ্ঞানীরা অস্ত্রটি তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ বুঝতে পেরেছিলেন—একবার পারমাণবিক অস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলে মানবজাতি এমন এক যুগে প্রবেশ করবে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন।

এই কারণেই রিপোর্টটির গুরুত্ব শুধু ১৯৪৫ সালে সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধের পর ম্যানহাটন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বিজ্ঞানী মনে করেছিলেন, তাঁরা যে অস্ত্র তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন, সেটির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের জন্য তাঁদেরই সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। বিজ্ঞানীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা সংগঠনগুলো পরে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও বিস্তার রোধের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

ফ্র্যাঙ্কের নাতি ফ্র্যাঙ্ক ভন হিপেলও পরবর্তী জীবনে একই ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনায় অংশ নিয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে মার্কিন প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা নীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

এটি এক ধরনের প্রজন্মান্তরের উত্তরাধিকার। একজন বিজ্ঞানী যে প্রশ্নটি যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে তুলেছিলেন, পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞানীরা সেটিকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদি আলোচনায় পরিণত করেছেন।

আজকের পৃথিবীর জন্য শিক্ষা

বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে আলোচনা আবারও নিরাপত্তা, প্রতিরোধক্ষমতা ও সামরিক শক্তির প্রশ্নে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ছে, রাষ্ট্রগুলো নিজেদের পারমাণবিক সক্ষমতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলছে। এমন পরিস্থিতিতে অস্ত্রের সামরিক কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা স্বাভাবিক।

কিন্তু এই আলোচনায় একটি মৌলিক প্রশ্ন হারিয়ে গেলে বিপদ আরও বাড়বে—কোনো অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব বলেই কি সেটি ব্যবহার করা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য?

ফ্র্যাঙ্ক রিপোর্টের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই। পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা শুধু তার বিস্ফোরণের শক্তিতে নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বেসামরিক মানুষের জীবন, আন্তর্জাতিক আস্থার সংকট এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি।

যে বিজ্ঞানীরা বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রকল্পে কাজ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যেই কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত সতর্ক করেছিলেন—মানবজাতির ওপর এই নতুন ধ্বংসক্ষমতার প্রথম ব্যবহারই ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

আট দশক পর সেই সতর্কবার্তার গুরুত্ব কমেনি। বরং পারমাণবিক অস্ত্র যত বেশি রাষ্ট্রের হাতে ছড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক যত বেশি অনিশ্চিত হয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে যে বিজ্ঞান ও সামরিক শক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি নৈতিক দায়িত্ব, আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক সংযমও সমান জরুরি।

ইতিহাস বদলানো যায় না। কিন্তু ইতিহাস থেকে কোন শিক্ষা নেওয়া হবে, সেটি বর্তমানের সিদ্ধান্ত। ফ্র্যাঙ্ক রিপোর্ট সেই সিদ্ধান্তের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে যায়—মানবজাতি কি তার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রের মালিক হতে চায়, নাকি সেই অস্ত্রের ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করার মতো যথেষ্ট দায়িত্বশীলও হতে চায়?