বিশ্বের স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোর স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। জাতিসংঘের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে মাত্র ১০টি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের মধ্যে ৪টিতে রোগী ও কর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধা রয়েছে। অন্যদিকে, ১১ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে কোনো ধরনের স্যানিটেশন সেবাই নেই।
কোটি কোটি মানুষ স্যানিটেশন সুবিধার বাইরে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘের শিশু তহবিলের যৌথ প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধার বৈশ্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৫ সালের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে ৭০টি দেশের উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধার আওতায় এমন শৌচাগারকে ধরা হয়েছে, যা রোগী ও কর্মীদের ব্যবহার উপযোগী। এর মধ্যে কর্মীদের জন্য অন্তত একটি পৃথক শৌচাগার, নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা শৌচাগারের ব্যবস্থা এবং মাসিক স্বাস্থ্যবিধির প্রয়োজনীয় সুবিধা থাকতে হবে। পাশাপাশি চলাচলে সীমাবদ্ধতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের জন্য অন্তত একটি ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার থাকা আবশ্যক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ১১ শতাংশের বেশি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে কোনো স্যানিটেশন সেবা নেই। এসব কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা প্রায় ৯৩ কোটি ৬০ লাখ।
অঞ্চলভেদে বড় ধরনের বৈষম্য
স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের স্যানিটেশন ব্যবস্থায় অঞ্চলভেদে ব্যাপক পার্থক্য দেখা গেছে। সাহারা-দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলোতে মাত্র ২৩ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধা রয়েছে। বিপরীতে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় এ হার ৫৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দরিদ্র দেশগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোর মাত্র ২৪ শতাংশে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মৌলিক মানদণ্ড পূরণ করা হয়।

পানি ও পরিচ্ছন্নতাতেও ঘাটতি
শুধু শৌচাগার নয়, স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোর পানি, হাত পরিষ্কার রাখা, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা ও চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ৮৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে মৌলিক পানি সরবরাহ ছিল। মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি সুবিধা ছিল ৭২ শতাংশ কেন্দ্রে। আর চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনার মৌলিক মানদণ্ড পূরণ করেছিল ৭১ শতাংশ কেন্দ্র।
পরিবেশগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও দুর্বল। মাত্র ৫৯ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষিত কর্মী—দুই ধরনের শর্তই পূরণ করা হয়েছে।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বড় ঝুঁকি
পরিবেশগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কিন্তু প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ১৮ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে এই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দুটি মৌলিক শর্তের কোনোটিই পূরণ করা হয় না।
এসব কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৫০ কোটি। ফলে অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন, পানি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কারণে রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী এবং দর্শনার্থীদের সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।
বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোকে নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়টিও যে সমান গুরুত্বপূর্ণ, জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্যসেবার স্যানিটেশন সংকট, স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি এবং কোটি কোটি মানুষের নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















