রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়ে উত্তর কোরিয়া যখন নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে, তখন দক্ষিণ কোরিয়া ক্রমেই নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির দাবি অনুযায়ী, রাশিয়ার সামরিক অভিযানে সহায়তার জন্য উত্তর কোরিয়া আরও ৫০ হাজার সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে সিউল বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
উত্তর কোরিয়া-রাশিয়া সামরিক জোট আরও গভীর
২০২৪ সালের জুনে পিয়ংইয়ং ও মস্কো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। এর কয়েক মাসের মধ্যেই প্রায় ১৫ হাজার উত্তর কোরীয় নাগরিক রাশিয়ায় মোতায়েন হয়। তাদের মধ্যে নির্মাণকর্মী, সরবরাহ ও লজিস্টিকস কর্মী, ক্ষেপণাস্ত্র অপারেটর, প্রকৌশলী এবং পদাতিক সেনা ছিল। প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন ছিলেন বিশেষ বাহিনীর সদস্য।
এই সহযোগিতা উত্তর কোরিয়ার জন্যও বড় সুবিধা বয়ে এনেছে। উত্তর কোরীয় সেনারা এখনো ইউক্রেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভূখণ্ডে সরাসরি যুদ্ধ করেনি। তবে রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ২০২৪ সালের অভিযানের সময় তারা স্থলযুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রও ইউক্রেনে ব্যবহার করা হয়েছে। বিনিময়ে পিয়ংইয়ং রাশিয়ার কাছ থেকে নতুন সামরিক প্রযুক্তি পেয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবেও এই সম্পর্ক উত্তর কোরিয়াকে সুবিধা দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির পর ২০২৫ সালে দেশটির অর্থনীতি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। রাশিয়ার কাছ থেকে সামরিক সহায়তার বিনিময়ে সরাসরি অর্থের পাশাপাশি জ্বালানি, খাদ্য, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ঋণ পরিশোধে ছাড় পাচ্ছে পিয়ংইয়ং।
যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় বদলাচ্ছে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা
দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, রাশিয়ায় অবস্থানরত উত্তর কোরীয় সেনারা আধুনিক যুদ্ধ থেকে কী শিখছে। কোরিয়ান যুদ্ধের পর বড় ধরনের প্রচলিত যুদ্ধে অংশ নেয়নি উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনী। কিন্তু এবার তারা ড্রোন নজরদারি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং নির্ভুল কামান হামলার মতো আধুনিক সামরিক কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের অস্ত্রের কার্যকারিতা মূল্যায়নের সুযোগও পাচ্ছে পিয়ংইয়ং।
সিউল অবশ্য ইউক্রেন যুদ্ধে সরাসরি জড়াতে আগ্রহী নয়। প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং ২০২৫ সাল থেকেই কোরীয় উপদ্বীপকে তার পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ১৫ আগস্ট তিনি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের লক্ষ্যে আলোচনার আহ্বানও জানান।

মার্কিন সহায়তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
দক্ষিণ কোরিয়া একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বার্ষিক উলচি ফ্রিডম শিল্ড মহড়ায় এখন প্রচলিত সামরিক কৌশলের পাশাপাশি ড্রোন, সাইবার হামলা এবং জিপিএস সংকেত বাধাগ্রস্ত করার মতো পরিস্থিতিও যুক্ত হয়েছে।
তবে সিউলের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহায়তা। ইউক্রেনের পাশাপাশি ইরান যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও দক্ষিণ কোরিয়া সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ১৬ আগস্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে। তিনি ইরান যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার অংশ না নেওয়া এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সঙ্গে নিজের ভালো সম্পর্ককে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
২০২৬ সালের শুরুতে ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করায় কোরিয়ায় মোতায়েন কিছু মার্কিন প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও ওয়াশিংটন ও সিউলের আলোচনা হয়েছিল।
৫০ হাজার অতিরিক্ত উত্তর কোরীয় সেনা রাশিয়ায় যাবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিচ্ছে—উত্তর কোরিয়া শক্তিশালী হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে।
উত্তর কোরিয়া-রাশিয়া সামরিক সহযোগিতা
উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়ে আধুনিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও নতুন প্রযুক্তি অর্জন করছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা কৌশলকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।
উত্তর কোরিয়া-রাশিয়া সামরিক সহযোগিতা
উত্তর কোরিয়ার রাশিয়াকে আরও ৫০ হাজার সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা, মস্কোর সঙ্গে সামরিক জোট এবং কমতে থাকা মার্কিন সহায়তা দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণ বদলে দিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















