ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে জটিলতার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। সাত বছর আগে কিমের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি বন্ধে সফল হতে পারেননি ট্রাম্প। এবারও একই ধরনের কূটনৈতিক ব্যর্থতা ঘটতে পারে কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে কিমের সঙ্গে তিন দফা মুখোমুখি বৈঠক হয়েছিল। সে সময় দুই নেতা নিজেদের মধ্যে ‘দারুণ সম্পর্ক’ গড়ে উঠেছে বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ হয়নি। বরং পরবর্তী সময়ে দেশটি অস্ত্র কর্মসূচি আরও জোরদার করে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার হাতে এখন প্রায় ৬০টি পরমাণু অস্ত্র রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রও দেশটির রয়েছে।
ইরান ও উত্তর কোরিয়ায় ভিন্ন কৌশল
বিশ্লেষকদের কাছে ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থান বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ইরানের সঙ্গে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি এখন হরমুজ প্রণালি সচল রাখার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরানের ইউরেনিয়াম মজুতের বড় অংশ ধ্বংসস্তূপের নিচে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প আবার আলোচনার পথ খুঁজছেন। রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিমের প্রশংসা করে ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক সামরিক মহড়ায় মার্কিন অংশগ্রহণ কমানোর নির্দেশ দেন। তবে পেন্টাগন কীভাবে এই অংশগ্রহণ কমাবে, সে বিষয়ে সোমবারও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
দক্ষিণ কোরিয়ার ওপরও চাপ
কিমের সঙ্গে যোগাযোগ পুনরায় শুরু করার বার্তার পাশাপাশি ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার ওপরও চাপ বাড়াচ্ছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ না দেওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিশ্রুত ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগ বাস্তবায়নের গতি নিয়েও ট্রাম্প অসন্তুষ্ট।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি নিয়ে পুরোনো ‘বোঝা ভাগ না করার’ অভিযোগকেও ট্রাম্প সিউলের ওপর চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
পুরোনো ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা
উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা অবশ্য বহু পুরোনো। ১৯৯৪ সালে আন্তর্জাতিক পরমাণু পরিদর্শকদের বহিষ্কারকে কেন্দ্র করে সংকট তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলার কথাও বিবেচনা করেছিল। পরে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের উদ্যোগে চুক্তি হলেও তা টেকেনি। ২০০৬ সালে উত্তর কোরিয়া প্রথম পরমাণু পরীক্ষা চালায় এবং ২০১৭ সাল পর্যন্ত আরও পাঁচটি পরীক্ষা করে।
২০১৮ সালে ট্রাম্প সিঙ্গাপুরে কিমের সঙ্গে বৈঠক করেন। তখন তিনি দ্রুত উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি dismantle হবে বলে আশাবাদ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৯ সালের ভিয়েতনাম সম্মেলন ভেঙে যাওয়ার পর সেই কূটনৈতিক উদ্যোগ কার্যত ব্যর্থ হয়। ইয়ংবিয়ন কেন্দ্রের বাইরে থাকা স্থাপনাগুলোও ভেঙে দিতে কিম রাজি না হওয়ায় আলোচনা থেমে যায়।
এবারও ঝুঁকি দেখছেন বিশ্লেষকেরা
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আবারও ট্রাম্প-কিম বৈঠক হলে তা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাদের মতে, বর্তমান কিম যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেয়ে নিজের পরমাণু অস্ত্র ধরে রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এদিকে ইরানের যুদ্ধ উত্তর কোরিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ পিয়ংইয়ংকে আরও দৃঢ়ভাবে বোঝাতে পারে যে, সম্ভাব্য সামরিক হামলা ঠেকাতে পরমাণু অস্ত্রই তাদের সবচেয়ে কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা।
ট্রাম্প অবশ্য তাঁর নীতির পক্ষে সাফাই দিয়ে বলেছেন, কিম সবসময় তাঁকে সম্মান করেছেন এবং তিনি কিমকে বোঝেন, কিমও তাঁকে বোঝেন। তবে ইরানের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান আর উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে আলোচনার আগ্রহ—এই দুই বিপরীতমুখী নীতি এখন ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
ইরান-উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে ট্রাম্পের দ্বিমুখী কৌশল
ট্রাম্পের উত্তর কোরিয়া নীতি, কিম জং-উনের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন আলোচনা এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তাঁর কঠোর অবস্থান এখন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















