ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ থামিয়ে কূটনৈতিক সমঝোতার পথে যাওয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগ ৬০ দিনের মাথায় বড় ধরনের অচলাবস্থায় পড়েছে। দুই মাস আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর পাশে বসে ভার্সাই প্রাসাদে এক জমকালো নৈশভোজে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের অবসানের সূচনা হয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত দুই মাসের সময়সীমা শেষ হলেও যুদ্ধ থামেনি, হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শুরুই হয়নি।
চুক্তির প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাচ্ছে ওয়াশিংটন
হোয়াইট হাউস শুরুতে ওই সমঝোতাকে ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরে বলেছিল, এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি খুলে যাবে এবং ইরান কখনো পরমাণু অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না। দুই মাসের মধ্যে অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতিকে আরও বিস্তৃত সমঝোতায় রূপ দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল।
কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আবারও জোরদার করেছে। একই সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকেও প্রশাসন সরে এসেছে। এর মধ্যে ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়নে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা, ইরানকে তেল বিক্রির সুযোগ দিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং হরমুজ প্রণালি পরিচালনা নিয়ে ইরান ও ওমানের সংলাপের বিষয়গুলো রয়েছে।
হরমুজ নিয়ে বাড়ছে উত্তেজনা
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল যে পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো, সেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ওমান বাধা সৃষ্টি করলে দেশটিতে হামলার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি ইরানকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানালেও বলেছেন, সমঝোতায় পৌঁছাতে তাঁর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন তাঁর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে না।
অর্থনৈতিক চাপের কৌশল
ট্রাম্প প্রশাসন এখন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে দেশটির নেতৃত্বকে ছাড় দিতে বাধ্য করার আশা করছে। প্রেসিডেন্টের জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার বলেছেন, যুদ্ধের পর ইরানের অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, মুদ্রার রেকর্ড দরপতন, তেল ও কর রাজস্ব কমে যাওয়া, পুনর্গঠন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় চাপের কথা তুলে ধরছেন।
তবে সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যালান আইরির মতে, এ ধরনের অর্থনৈতিক চাপের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে সাধারণ ইরানিদের ওপর। তাঁর মতে, যুদ্ধের কারণে একটি জটিল ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং সেটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার সহজ পথ নেই।
দেশের ভেতরেও চাপ বাড়ছে
ইরান যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানেও প্রভাব ফেলছে। ইকোনমিস্ট-ইউগভের সাম্প্রতিক জরিপে রিপাবলিকানদের মধ্যে ট্রাম্পের অনুমোদনের হার ৭৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সর্বনিম্ন এবং ক্ষমতায় ফেরার পরের সময়ের তুলনায় ১৫ পয়েন্ট কম। ওয়াশিংটন পোস্ট-ইপসোসের জরিপে মাত্র ১৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক তাঁর কাজকে দৃঢ়ভাবে অনুমোদন করেছেন।
তবে এসব পরিবর্তনের জন্য শুধু ইরান যুদ্ধকে দায়ী করা যাচ্ছে না। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দাম এবং সরকারের অন্যান্য নীতিও ভোটারদের অসন্তোষের কারণ। কিন্তু হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা ও তেল সরবরাহে বিঘ্ন এসব অর্থনৈতিক উদ্বেগকে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সংকটের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সঙ্গে গোপন আলোচনা চলছে। তবে সংগঠনটির এক মুখপাত্র তাৎক্ষণিকভাবে এ দাবি অস্বীকার করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে সামরিকভাবে ট্রাম্পের হাতে আকর্ষণীয় বিকল্প খুব কম। তবে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল থাকলে এবং নতুন করে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এড়ানো গেলে ইরান ইস্যু ধীরে ধীরে মার্কিন ভোটারদের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে নেমে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সামরিক ব্যর্থতাকেও রাজনৈতিকভাবে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ ট্রাম্পের সামনে থাকতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















