কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টার ও এআই ক্লাস্টারে ব্যবহৃত অপটিক্যাল মডিউলের চাহিদা বাড়ছে। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি উৎপাদনে চীন এখন বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০টি অপটিক্যাল মডিউল নির্মাতার সাতটিই চীনা কোম্পানি। দ্রুতগতির ৮০০জি ও তার বেশি ক্ষমতার মডিউল বাজারে শীর্ষ দুই প্রতিষ্ঠান ঝোংজি ইনোলাইট ও ইওপ্টোলিংক মিলেই ৬০ শতাংশের বেশি বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
চাহিদার সঙ্গে বাড়ছে বাজার
ট্রেন্ডফোর্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে ৪০০জি ও তার বেশি ক্ষমতার ট্রান্সসিভারের চালান ২ কোটি ইউনিট ছাড়িয়ে যায়, যা আগের বছরের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ৮০০জি ও তার বেশি ক্ষমতার পণ্য মোট চালানের ৬০ শতাংশের বেশি হতে পারে। সে সময় বার্ষিক চালান ৬ কোটি ৩০ লাখ ইউনিট ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এই প্রবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে চীনা কোম্পানিগুলোর শেয়ারবাজার মূল্যেও। এক বছরের মধ্যে ঝোংজি ইনোলাইটের শেয়ারের দাম প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য ১ ট্রিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়েছে। এ খাতের বড় কোম্পানিগুলো হংকংয়ে পুঁজি সংগ্রহও বাড়াচ্ছে। ২০২৬ সালে ঝোংজি ইনোলাইট হংকংয়ে ৫৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন হংকং ডলারের বড় প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও করেছে। ইওপ্টোলিংকও নিজস্ব শেয়ার ছাড়ার পরিকল্পনা জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতায় ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি
তবে এআই খাতের এই উত্থান চীনের অপটিক্যাল মডিউল শিল্পের দুর্বলতাও স্পষ্ট করে তুলছে। শিল্পটির বড় নির্ভরতা মার্কিন গ্রাহকদের ওপর। চীনা কোম্পানিগুলোর তুলনায় মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো এআই অবকাঠামোয় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করেছে। ২০২৫ সালে শীর্ষ দুই চীনা কোম্পানির বিক্রির ৯০ শতাংশেরও বেশি এসেছে বিদেশি গ্রাহকদের কাছ থেকে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। মার্কিন আমদানিতে সম্ভাব্য বিধিনিষেধের বিষয়ে রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনের পর ঝোংজি ইনোলাইটের শেয়ারের দাম একদিনে ১৩ শতাংশ কমে যায়। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, চীনা সরবরাহকারীদের বাজারে প্রবেশ বন্ধ হলে অ-চীনা নির্মাতারা মোট চাহিদার মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম হতে পারে। ঝুঁকি কমাতে চীনা কোম্পানিগুলো থাইল্যান্ডে উৎপাদন ঘাঁটি গড়ে তুলছে।

উল্টো দিকেও সরবরাহ-ঝুঁকি
চীন যেখানে অপটিক্যাল মডিউল সংযোজনে এগিয়ে, সেখানে উচ্চমূল্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের জন্য দেশটির শিল্প এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে রয়েছে ডিএসপি এবং উচ্চমানের ইএমএল চিপ। তবে প্যাসিভ উপাদান উৎপাদনে চীনের সক্ষমতা বেড়েছে। ইউয়ানজির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অপটিক্যাল চিপ উৎপাদনেও ব্যবধান কমিয়ে আনছে, যার পেছনে ঝোংজি ইনোলাইটের বিনিয়োগ সহায়ক হয়েছে।
বেইজিংও স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে উচ্চমানের ২০০জি ইএমএল চিপের দেশীয় সরবরাহ ৪৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে উন্নত ডিএসপি চিপে চীনা কোম্পানিগুলো এখনো অনেক পিছিয়ে।
প্রযুক্তি পরিবর্তনেও নতুন চ্যালেঞ্জ
বর্তমান প্লাগেবল অপটিক্যাল মডিউল বাজারের জন্য দীর্ঘমেয়াদে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে কো-প্যাকেজড অপটিকস বা সিপিও প্রযুক্তি। ফলে চীনা নির্মাতারা ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নিয়ে ঝুঁকি কমাতে একাধিক প্রযুক্তিগত সম্ভাবনায় বিনিয়োগ করছে।
তা সত্ত্বেও ব্যবসার গতি এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। ঝোংজি ইনোলাইটের অর্ডার বুক ২০২৬ সালের পুরো বছরজুড়ে পূর্ণ রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেড়ে ১৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছেছে।
তবে বিনিয়োগকারীদের বড় প্রশ্ন এখন একটাই—এআই কোম্পানিগুলোর বিপুল অবকাঠামো ব্যয় কতদিন ধরে রাখা সম্ভব হবে এবং সেই বিনিয়োগ থেকে পর্যাপ্ত আর্থিক রিটার্ন আসবে কি না। এ অনিশ্চয়তাই চীনের এআই উপাদান শিল্পের দ্রুত উত্থানের পাশাপাশি বাজারে বড় ঝুঁকির জায়গা তৈরি করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















