আকাশে উড়ে যাওয়া বিমানের পেছনে দেখা সাদা রেখাগুলোকে অনেকেই সাধারণ ধোঁয়া বলে মনে করেন। কিন্তু এসব রেখা বা ঘনীভূত বাষ্পপথ কখনও কখনও পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। এবার সেই সমস্যা কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বিমান চলাচলের পথ সামান্য পরিবর্তনের পরীক্ষা শুরু করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় শনাক্ত হবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা
যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে ৩০ মাসের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে শনাক্ত করা হবে, আকাশের কোন এলাকায় বিমানের পেছনে দীর্ঘস্থায়ী বাষ্পপথ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন ব্লু স্কাইস’। এতে গুগল, যুক্তরাজ্য সরকার, আবহাওয়া দপ্তর, বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা যুক্ত রয়েছেন।
পরীক্ষাটি উত্তর আটলান্টিকের পূর্বাংশের শ্যানউইক মহাকাশ এলাকায় পরিচালিত হবে। বিশ্বের মোট বাষ্পপথজনিত উষ্ণায়নের প্রায় ৫ শতাংশ এই এলাকার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কীভাবে তৈরি হয় বিমানের সাদা রেখা
বিমানের ইঞ্জিন থেকে বের হওয়া অত্যন্ত গরম গ্যাস যখন অনেক উঁচুতে থাকা ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে আসে, তখন ক্ষুদ্র বরফকণা তৈরি হয়। এগুলোই আকাশে সাদা রেখার মতো দেখা যায়।
অনেক ক্ষেত্রে এই রেখা দ্রুত মিলিয়ে যায়। তবে বাতাস অত্যন্ত ঠান্ডা ও আর্দ্র হলে এগুলো দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারে এবং ছড়িয়ে পড়ে মেঘের মতো স্তর তৈরি করে।
এই মেঘ পৃথিবী থেকে মহাশূন্যে বেরিয়ে যেতে থাকা তাপ আটকে রাখতে পারে। ফলে সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
গবেষকদের ধারণা, বিমান চলাচলের কারণে সৃষ্ট মোট জলবায়ু উষ্ণায়নের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই দীর্ঘস্থায়ী বাষ্পপথের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সামান্য উচ্চতা পরিবর্তনেই এড়ানো যাবে বাষ্পপথ
প্রকল্পে উপগ্রহের ছবি ও আগের বিমান চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন এলাকায় বাষ্পপথ তৈরি হয়েছে তা শনাক্ত করা হবে। এরপর আবহাওয়ার তথ্যের সঙ্গে এসব তথ্য মিলিয়ে ভবিষ্যতে কোথায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তার পূর্বাভাস দেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
এই পূর্বাভাস বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণকারীদের কাছে পাঠানো হবে। তারা প্রয়োজন অনুযায়ী পাইলটদের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলার নির্দেশ দিতে পারবেন।
এর জন্য বিমানের গতিপথে বড় ধরনের পরিবর্তন করার প্রয়োজন হবে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উড্ডয়ন উচ্চতা প্রায় ২ হাজার ফুট পরিবর্তন করলেই হবে। ঝড় বা তীব্র ঝাঁকুনি এড়াতে বিমানগুলো যেভাবে নিয়মিত উচ্চতা পরিবর্তন করে, অনেকটা সেভাবেই এই ব্যবস্থা পরিচালিত হবে।

অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ নিয়ে প্রশ্ন
তবে উচ্চতা পরিবর্তন করলে বিমানের জ্বালানি খরচ কিছুটা বাড়তে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বাষ্পপথ এড়াতে গিয়ে অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ হলে সামগ্রিকভাবে জলবায়ুর লাভ কতটা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট গবেষকদের দাবি, বাড়তি জ্বালানি ব্যবহারের কারণে যে অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ হবে, তা দীর্ঘস্থায়ী উষ্ণতাবর্ধক বাষ্পপথ ঠেকিয়ে পাওয়া জলবায়ুগত সুবিধার তুলনায় অনেক কম।
পরীক্ষামূলক হিসাব অনুযায়ী, শ্যানউইক এলাকার ভেতর দিয়ে পুরোপুরি বিকল্প পথে গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিমানের প্রায় ১০০ কেজি অতিরিক্ত জ্বালানি প্রয়োজন হতে পারে।
আগের কয়েকটি বিমান সংস্থাভিত্তিক পরীক্ষায় বাষ্পপথ তৈরি বা এর উষ্ণতা সৃষ্টির প্রভাব প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনা দেখা গেছে।
শীতের রাতে চলবে পরীক্ষা
২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ সালের শীতকালে নির্দিষ্ট কিছু সন্ধ্যা ও রাতে পরীক্ষাটি চালানো হবে। এ সময় উত্তর আটলান্টিকে বিমান চলাচল তুলনামূলক কম থাকে।
প্রায় ১০ হাজার বিমান পরীক্ষাধীন আকাশসীমার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর মধ্যে অল্পসংখ্যক বিমানেরই বাষ্পপথ এড়াতে উচ্চতা পরিবর্তন করতে হবে।
প্রকল্পে যুক্তরাজ্য সরকার প্রায় ২৬ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড এবং গুগল প্রায় ১৪ লাখ পাউন্ড অর্থ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।
পরীক্ষার ফলাফল পরে গবেষণাপত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে, যাতে বিশ্বের অন্যান্য গবেষকেরাও এর কার্যকারিতা যাচাই করতে পারেন।
উড়োজাহাজ বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে পরিবেশগত চাপ
বিমান চলাচলের পরিবেশগত ক্ষতি কমানোর এই উদ্যোগ এমন সময়ে নেওয়া হচ্ছে, যখন যুক্তরাজ্য সরকার দেশটির বিমানবন্দর সম্প্রসারণের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে।
ফলে প্রযুক্তির সাহায্যে বিমান চলাচলের ক্ষতিকর প্রভাব কতটা কমানো সম্ভব, আর একই সঙ্গে আকাশপথে যাত্রীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে পরিবেশগত চাপ কতটা সামলানো যাবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এই পরীক্ষার সফলতা সেই প্রশ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তর দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















