ভারতে উচ্চশিক্ষার দ্রুত সম্প্রসারণ তরুণদের জন্য ভালো চাকরির নিশ্চয়তা তৈরি করতে পারছে না। বরং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পরিবারের সঞ্চয় শেষ করা এবং ব্যাংকঋণ নেওয়া অনেক শিক্ষার্থীর জন্য পরিণত হচ্ছে ঋণ ও হতাশার বোঝায়।
নয়ডা ও গ্রেটার নয়ডার পাঁচটি নলেজ পার্ককে ঘিরে গড়ে ওঠা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। গত এক দশকে এসব প্রতিষ্ঠানের বিস্তার ঘটলেও স্নাতকদের জন্য ভালো বেতনের চাকরির সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে ডিগ্রি অর্জনের পর কর্মসংস্থানের বদলে অনেকের সামনে দাঁড়াচ্ছে ঋণ পরিশোধের কঠিন বাস্তবতা।
উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিস্তার
ভারতের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন সীমিত এবং প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র। দেশটিতে প্রায় ৫৫০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও মাত্র প্রায় এক-দশমাংশকে শীর্ষস্থানীয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে গড়ে বছরে ২৫০ ডলারেরও কম টিউশন ফি দিয়ে পড়ার সুযোগ থাকলেও শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে পাঁচ শতাংশেরও কম আবেদনকারী ভর্তি হতে পারেন।
ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছে। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরের দশকে ভারতের বেসরকারি কলেজের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ হয়েছে। ২০২৪ সালে দেশটির উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ কোটি ৫০ লাখ, যা এক দশকের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেশি। এদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়ছে।
ডিগ্রির সঙ্গে চাকরির মিল নেই
সমস্যার বড় দিকটি হলো শিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বাড়লেও ভালো চাকরি তৈরি হচ্ছে অনেক ধীরগতিতে। আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২৫ বছরের কম বয়সী ভারতীয় স্নাতকদের প্রায় ৪০ শতাংশ বেকার। একই সময়ে মাসে ৫০০ ডলারের বেশি বেতন দেয়—এমন নতুন চাকরি বছরে তৈরি হয় মাত্র প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার।
শিক্ষা খাতের উদ্যোক্তা অক্ষয় সাক্সেনার মতে, তরুণদের কাছে এমন একটি ধারণা বিক্রি করা হয়েছে যে ডিগ্রি মানেই চাকরি। অথচ বাস্তবে বেসরকারি প্রকৌশল শিক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে সম্ভাব্য আয়ের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, বছরে প্রায় চার লাখ শিক্ষার্থী বেসরকারি প্রকৌশল কলেজে ২০ হাজার ডলারের বেশি ব্যয় করে, অথচ স্নাতকদের মধ্যম বেতন বছরে প্রায় ৩ হাজার ডলার।
ঋণের চাপে শিক্ষার্থীরা
বারাণসীর ১৮ বছর বয়সী হর্ষিত রাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও যন্ত্রশিক্ষা পড়ছেন। তাঁর ডিগ্রির সম্ভাব্য খরচ প্রায় ১৫ হাজার ডলার, যার মধ্যে ৭ হাজার ডলার ব্যাংকঋণ। তিনি মাসে ৮০ হাজার রুপি আয় করার আশা করছেন। তবে অর্ধেক বেতন পেলেও শিক্ষা ব্যয়ের টাকা তুলতে পাঁচ থেকে ছয় বছর লেগে যেতে পারে। পড়াশোনা শেষ হওয়ার এক বছর পর তাঁর ঋণে বার্ষিক ১০ শতাংশ হারে সুদ জমা শুরু হবে।
নয়ডার আরেক শিক্ষার্থী অতুল আনন্দের ডিগ্রি ও জীবনযাত্রার মোট খরচ প্রায় ১৫ হাজার ডলার। এর মধ্যে রাজ্য সরকার তাঁকে ৪ হাজার ডলার ঋণ দিয়েছে এবং পরিবারের সঞ্চয়ও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। খরচ সামলাতে তিনি রাতে গ্রাফিক ডিজাইনের ফ্রিল্যান্স কাজ করেন।

তরুণদের ক্ষোভের পেছনে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়
শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে গত মাসের ব্যাপক শিক্ষার্থী বিক্ষোভে পরীক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের দাবি সামনে এলেও এর পেছনে আরও গভীর উদ্বেগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের সঙ্গে বেকারত্ব, উচ্চশিক্ষার ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা জড়িয়ে আছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি। ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাত একসময় প্রকৌশল স্নাতকদের জন্য বড় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে সেই চাকরিগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
শিক্ষা খাতের এই ব্যবধান শেষ পর্যন্ত এমন এক বাস্তবতা তৈরি করছে, যেখানে উচ্চশিক্ষা মধ্যবিত্তে ওঠার পথ হওয়ার বদলে অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে। ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসনের তুলনায় আগ্রহী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, আবার স্নাতকের তুলনায় ভালো চাকরির সুযোগও কম। ফলে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার আশায় নেওয়া শিক্ষা ঋণই অনেক তরুণের জন্য নতুন অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে উঠছে।
ভারতের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাত, শিক্ষাঋণ ও তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট—এই তিনটি বিষয় এখন একই সমস্যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
ভারতের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাঋণ বাড়ছে, কিন্তু স্নাতকদের জন্য ভালো চাকরি তৈরি হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষার খরচ ও বেকারত্ব তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















