যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ এই সপ্তাহেই ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। আগের পূর্বাভাসের তুলনায় কয়েক মাস আগেই এই সীমায় পৌঁছানোর পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাতিল হওয়া শুল্ক থেকে সম্ভাব্য শত শত কোটি ডলারের রাজস্ব হারানো। রাজস্ব ঘাটতি পূরণে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগকে দ্রুতগতিতে ঋণ নিতে হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট
সোমবার ট্রেজারি বিভাগের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের মোট জাতীয় ঋণ ৩৯.৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মাত্র ছয় মাস আগে নির্দলীয় কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস বা সিবিও চলতি অর্থবছরে ঋণ ৩৯.৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঋণ নেওয়ার গতি সেই হিসাবকে ছাড়িয়ে গেছে।
ঋণসীমাতেও দ্রুত পৌঁছানোর শঙ্কা
ঋণ বৃদ্ধির এই গতি অব্যাহত থাকলে কংগ্রেস নির্ধারিত ৪১.১ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণসীমাতেও নির্ধারিত সময়ের আগে পৌঁছাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। বাজেট বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী বছরের শুরুর দিকেই এই সীমা স্পর্শ করতে পারে দেশটি। তখন কংগ্রেসকে ঋণসীমা স্থগিত অথবা আবার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় সরকারের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা বা ডিফল্টের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্পও ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে সতর্ক হয়েছেন। আগস্টের অবকাশে যাওয়ার আগে তিনি সিনেটকে ‘ক্রমেই সামনে আসা ঋণসীমার বিপর্যয়’ মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জন থুনও স্বীকার করেছেন, ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ এমন একটি বিষয় যা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে বাড়ছে ঋণ
গত প্রায় ২৫ বছর ধরে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের শাসনামলেই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ বেড়েছে। জর্জ ডব্লিউ বুশ আমলের কর ছাড়, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ, বৈশ্বিক মন্দা, ২০১৭ সালের ট্রাম্পের কর সংস্কার এবং করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলায় জো বাইডেন প্রশাসনের প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সহায়তা—সব মিলিয়ে ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েছে।
২০১৬ সালে প্রথমবার নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প আট বছরের মধ্যে জাতীয় ঋণ দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
শুল্ক বাতিলের ধাক্কায় কমেছে রাজস্ব
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ও রাজস্বের ব্যবধান প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ফেব্রুয়ারিতে সিবিও জানিয়েছিল। এর কয়েক দিন পর সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক বাতিল করে। এতে ফেডারেল সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার কমে যাওয়ার হিসাব করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি সরকারি নগদ মজুত বাড়াতেও সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেজারি বেশি ঋণ নিচ্ছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাতকে কেন্দ্র করে সামরিক ব্যয় বাড়লে আগামী মাসগুলোতে ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে দ্বিদলীয় নীতিকেন্দ্র।
দেউলিয়া নয়, তবে ঝুঁকি বাড়ছে
ঋণসীমায় পৌঁছানো মানেই তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ডিফল্ট করবে—এমন নয়। সীমা অতিক্রমের পর ট্রেজারি নগদ মজুত ব্যবহার এবং বিশেষ হিসাব পদ্ধতি বা ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি মেজার্স’ অবলম্বন করে সাধারণত আরও ছয় থেকে নয় মাস সরকারি বিল পরিশোধ চালিয়ে যেতে পারে। এরপরও অর্থের ঘাটতি দেখা দিলে ‘এক্স-ডেট’ বা সংকটের সময়সীমা চলে আসবে।
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে নভেম্বর-ডিসেম্বরে নতুন কংগ্রেস বসার আগেই ঋণসীমা বাড়ানোর চেষ্টা হতে পারে। তবে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও বিশেষ করে অল্প সংখ্যাগরিষ্ঠতার হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে দলীয় কট্টর ব্যয়সংযমপন্থীদের সমর্থন পাওয়া কঠিন হতে পারে।
সুদের বোঝাও বাড়ছে
জাতীয় ঋণের পাশাপাশি সুদ পরিশোধও বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ৩০ বছর মেয়াদি বন্ড ৫.২১৬ শতাংশ সুদে বিক্রি করেছে, যা প্রায় ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই সুদের হার বন্ধকী ঋণ, করপোরেট ঋণসহ অন্যান্য ঋণের খরচেও প্রভাব ফেলে।
সিবিওর হিসাবে, চলতি বছর জাতীয় ঋণের বার্ষিক সুদ পরিশোধ ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে। এটি প্রায় পেন্টাগনের বার্ষিক বাজেটের সমান। বর্তমানে ফেডারেল সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ১৯ শতাংশ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে এবং ২০৩৬ সালের মধ্যে তা ২৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
বাজেট বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ঋণের বর্তমান গতি অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ট্রাস্ট ফান্ডও কংগ্রেস পদক্ষেপ না নিলে ২০৩২ সালে অর্থসংকটে পড়তে পারে, যার ফলে সুবিধা ২২ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়াকে তাই শুধু একটি বড় সংখ্যা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান রাজস্ব ঘাটতি, ঋণের সুদ এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতার বড় প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















