ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অবস্থানে সূক্ষ্ম পার্থক্য সামনে এসেছে। ভ্যান্স যেখানে ইরান নীতিতে প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে তেল ও গ্যাসের দাম কম রাখার কথা বলেছেন, সেখানে ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়েছেন—ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকানোই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
গ্যাসের দাম বনাম পারমাণবিক হুমকি
ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেছিলেন, ইরান ইস্যুতে প্রশাসনের প্রথম লক্ষ্য হলো আমেরিকানদের জন্য তেল ও গ্যাসের দাম সাশ্রয়ী রাখা। এরপরের লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। কিন্তু সোমবার ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, তাঁর ‘নম্বর ওয়ান গোল’ সবসময়ই থাকবে—ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারবে না।
এই ভিন্ন অগ্রাধিকার এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম ভোটারদের কাছে বড় রাজনৈতিক ইস্যু। গ্যাসের জাতীয় গড় দাম গত এক সপ্তাহে প্রায় ৮ সেন্ট বেড়ে প্রতি গ্যালন ৪.০২ ডলারে উঠেছে। চলতি বছরে এটি তৃতীয়বারের মতো ৪ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। একই সময়ে ডিজেলের দাম ১৪.৩ সেন্ট বেড়ে গ্যালনপ্রতি ৫.৪২ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা পরিবহন ব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি করছে।
রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক চাপ
জ্বালানির বাড়তি দাম রিপাবলিকান শিবিরের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কারণ ক্ষমতাসীন দলকে সাধারণত উচ্চমূল্যের জন্য ভোটারদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিপাবলিকানদের মধ্যে আশঙ্কা বাড়ছে—জ্বালানির দাম নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ এতটাই গভীর হয়ে উঠতে পারে যে পরে দাম কমলেও রাজনৈতিক ক্ষতি সহজে কাটবে না।
এর মধ্যে ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ারও স্পষ্ট লক্ষণ নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প এমনকি ওমানকে বোমা হামলার হুমকিও দিয়েছেন। দেশটি ইরানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা করছিল।
হোয়াইট হাউসের দাবি, কোনো বিভাজন নেই
ট্রাম্প ও ভ্যান্সের মধ্যে মতপার্থক্যের বিষয়টি অবশ্য হোয়াইট হাউস প্রত্যাখ্যান করেছে। মুখপাত্র আনা কেলি বলেছেন, কোনো বিভাজন নেই এবং ট্রাম্পের অবস্থান—ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটও বলেছেন, জ্বালানির দাম কম রাখা এবং ইরানকে নিরস্ত্রীকরণ—দুটি লক্ষ্যই প্রেসিডেন্টের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ভ্যান্সও এর আগে বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট সিদ্ধান্ত নেন এবং প্রশাসনের সবাই সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধ। তবে তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, ইরান নীতিতে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের অগ্রাধিকার কতটা অভিন্ন।

২০২৮-এর রাজনীতি ও ভ্যান্সের ভবিষ্যৎ
এই টানাপোড়েন শুধু ইরান বা গ্যাসের দামেই সীমাবদ্ধ নয়। ৪২ বছর বয়সী ভ্যান্সকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হয়। ট্রাম্প ইতিমধ্যে দাতাদের সঙ্গে আলোচনায় ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রসঙ্গে ‘জেডিকে নির্বাচিত করতে হবে’ বলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও তাঁর উপদেষ্টারা এটিকে ভ্যান্সকে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে সমর্থনের ঘোষণা হিসেবে দেখছেন না; বরং ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনাও সামনে রাখা হয়েছে।
ফলে ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দায় তৈরি করতে পারে—এমন নীতির সঙ্গে নিজের অবস্থান কতটা জড়াবেন, সেটিও ভ্যান্সের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইরান নীতি, জ্বালানির দাম ও ২০২৮ সালের রাজনৈতিক সমীকরণ—এই তিনটি বিষয় এখন ট্রাম্প-ভ্যান্স সম্পর্কের ওপর নতুন করে নজর কাড়ছে।
ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প-ভ্যান্স দ্বন্দ্ব এবং গ্যাসের দাম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চাপ নতুন করে রিপাবলিকান শিবিরের ভবিষ্যৎ কৌশলকে আলোচনায় এনেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















