বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী নেই—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের এমন বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীসহ ৪৪ জন নাগরিক। গত ১১ আগস্ট ঢাকায় ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় দেওয়া দুই মন্ত্রীর বক্তব্যের পর এই প্রতিবাদ জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচয় অস্বীকার করা শুধু অনভিপ্রেত নয়, এটি তাদের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অধিকারের জন্যও হুমকি তৈরি করতে পারে।
আদিবাসী পরিচয় ও বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পরস্পরবিরোধী নয়
নাগরিকদের বক্তব্যে বলা হয়, বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্যরা একই সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিক এবং নিজ নিজ স্বতন্ত্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অংশ। সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে।
বিবৃতিতে জাতিসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্রের কথাও তুলে ধরা হয়। সেখানে নাগরিকত্বের প্রতি কোনো বৈষম্য ছাড়াই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিচয় নির্ধারণের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। স্বাক্ষরকারীদের মতে, আদিবাসী পরিচয়ের স্বীকৃতি জাতীয় ঐক্য বা সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি নয়; বরং বৈচিত্র্য, মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তিকে শক্তিশালী করে।
আইএলও কনভেনশন ১০৭-এর দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ
দুই মন্ত্রীর বক্তব্যে বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশন ১৬৯ অনুসমর্থন করেনি—এ বিষয়টি উল্লেখ করা হলেও নাগরিকদের বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ১৯৫৭ সালের আইএলও কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করেছে। এটি আইনত বাধ্যতামূলক হওয়ায় আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর পরিচয়, সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান এবং ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন ভূমির অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে বাংলাদেশের দায়বদ্ধতা রয়েছে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন আইন ও নীতিমালায়ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা, অর্থ আইন ১৯৯৫, আয়কর আইন ২০২৩, দ্রুত দারিদ্র্য হ্রাসকরণ বিষয়ক জাতীয় কর্মকৌশল এবং জাতীয় শিক্ষা নীতির কথা বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘রেইনবো নেশন’ অঙ্গীকার নিয়েও প্রশ্ন
বিবৃতিতে বলা হয়, বর্তমান বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাদেশে বসবাসরত সব জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে দেশকে ‘রেইনবো নেশন’-এ রূপান্তরের অঙ্গীকার করা হয়েছে। তাহলে দেশে আদিবাসী বা ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী না থাকার বক্তব্যের সঙ্গে সেই অঙ্গীকার কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ—এ প্রশ্নও তুলেছেন নাগরিকরা।
তারা বিএনপির সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার ২০০৩ সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের বার্তার কথাও স্মরণ করেন। ওই বার্তায় তিনি আদিবাসীদের বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর অংশ এবং সমান মর্যাদার নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। একই সঙ্গে তাদের ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি
৪৪ নাগরিকের বিবৃতিতে বলা হয়, দুই মন্ত্রীর বক্তব্য সংবিধান, আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই অবিলম্বে বক্তব্য প্রত্যাহার করে জনমনে সৃষ্ট বিভ্রান্তি দূর করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল পদে থাকা মন্ত্রীদের এমন বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি, মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন সুলতানা কামাল, খুশী কবির, রাশেদা কে চৌধুরী, ড. ইফতেখারুজ্জামান, শাহিন আনাম, জেড আই খান পান্না, সারা হোসেন, শামসুল হুদা, ড. সুমাইয়া খায়ের, ড. সামিনা লুৎফা, ড. জোবাইদা নাসরীন, পাভেল পার্থ, সায়দিয়া গুলরুখ, মিঠুন রাকসান, হাফিজ রশিদ খান, দীপায়ন খীসাসহ মোট ৪৪ জন। বিবৃতিটি প্রেরণ করেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।
বাংলাদেশে আদিবাসী পরিচয় অস্বীকারের প্রতিবাদ জানিয়ে ৪৪ নাগরিক দুই মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার এবং সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















