চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি ১২ আগস্ট ৯৭ বছর বয়সে মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে শুধু একজন প্রবীণ রাষ্ট্রনায়কের বিদায় ঘটেনি; শেষ হয়েছে চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়েরও। গত কয়েক দশকে সস্তা ও বিপুল পণ্যের যে সরবরাহে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে, তার পেছনে যে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন কাজ করেছে, ঝু রংজি ছিলেন তার অন্যতম প্রধান নির্মাতা।
তাঁকে সাধারণত একজন কঠোর, হিসাবনির্ভর ও দক্ষ প্রযুক্তিবিদ হিসেবে স্মরণ করা হয়। কিন্তু এই পরিচয় তাঁর ব্যক্তিত্বের পুরোটা প্রকাশ করে না। তাঁর মধ্যে ছিল মানুষের জীবন নিয়ে গভীর উদ্বেগ, নতুন কিছু বোঝার অদম্য কৌতূহল এবং দেশের পরিবর্তনের জন্য অসাধারণ ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা।
একজন রাষ্ট্রনায়কের অন্যরকম মুখ
১৯৮৭ সালে প্রথম ঝু রংজির সঙ্গে আমার পরিচয়। তখন তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত কোনো বড় নাম নন; সাংহাইয়ের মেয়র হওয়ার পথে এগোচ্ছেন। কিন্তু তাঁকে যারা চিনতেন, তারা বুঝেছিলেন—এই মানুষটি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন।
পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁর সঙ্গে কথা বলার এবং সময় কাটানোর সুযোগ আমার হয়েছিল। তাঁর যে দিকটি সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে, তা হলো কাজের প্রতি তাঁর এক ধরনের প্রায় নির্মম নিষ্ঠা।

১৯৯৮ সালে একবার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখলাম, তিনি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক দেরিতে এসেছেন। কারণ তিনি তখন ভয়াবহ বন্যাকবলিত অঞ্চল ঘুরে ফিরেছেন। ক্লান্তিতে তাঁর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নিজের ক্লান্তির কথা না বলে তিনি কথা বলতে শুরু করলেন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন নিয়ে—কত মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, কত দ্রুত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয় এবং এর দীর্ঘস্থায়ী মূল্য কতটা কঠিন হতে পারে।
এই ঘটনাই তাঁর নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যকে সামনে আনে। অর্থনৈতিক সংস্কার তাঁর কাছে কেবল পরিসংখ্যান বা উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয় ছিল না; এর সঙ্গে মানুষের জীবন সরাসরি যুক্ত ছিল।
সংস্কারের কঠিন মূল্য
চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের কৃতিত্ব সাধারণত দেং শিয়াওপিংয়ের নামে উচ্চারিত হয়। সেটি যথার্থ, কারণ দেং সংস্কারের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। এরপর জিয়াং জেমিনের সময় ঝু রংজি এমন একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিসর পেয়েছিলেন, যেখানে তিনি বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিবর্তন বাস্তবায়ন করতে পারেন।
কিন্তু পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব ছিল ঝুর ওপর। আর সেই কাজ মোটেও সহজ ছিল না।
তিনি শুল্ক ব্যাপকভাবে কমিয়েছিলেন, কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রের আকার অর্ধেক করেছিলেন এবং করব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজিয়েছিলেন। সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল অকার্যকর রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে কোটি কোটি শ্রমিককে বের করে দেওয়া। তিনি জানতেন, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেককে আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তিনি এটাও জানতেন যে এই পরিবর্তনের ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
তারপর আসে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের প্রবেশের প্রশ্ন। দীর্ঘ ও কঠিন আলোচনার পর চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেয়। এর পরবর্তী সময়ে দেশটি বৈদেশিক বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান গন্তব্যে পরিণত হয় এবং বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় শক্তি হয়ে ওঠে।
এটি কেবল চীনের অর্থনীতিকে বদলায়নি। বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামোকেও বদলে দিয়েছে।
সমৃদ্ধি ও স্বাধীনতার জটিল সম্পর্ক
চীনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন প্রায়ই সামনে এসেছে—অর্থনৈতিক সাফল্যের সঙ্গে দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতির সম্পর্ক কী?
এ প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মূল্য অপরিসীম। কিন্তু মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রার উন্নতিও মানবাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা। একটি শিশু পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে কি না, একটি পরিবার নিরাপদ আশ্রয় পাচ্ছে কি না, একটি দেশের মানুষ দারিদ্র্যের নিচু স্তর থেকে উঠে দাঁড়াতে পারছে কি না—এসবও মানবকল্যাণের মৌলিক প্রশ্ন।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ঝু রংজির অর্থনৈতিক সংস্কারকে কেবল প্রবৃদ্ধির প্রকল্প হিসেবে দেখা যায় না। এটি কোটি কোটি মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের একটি বিশাল প্রক্রিয়া ছিল।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিকল্প। বরং দীর্ঘমেয়াদে সমৃদ্ধ সমাজে অধিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হতে পারে—এমন বিশ্বাসও এই দৃষ্টিভঙ্গির অংশ।
বিশ্বের জন্য চীনের উত্থানের মূল্য
ঝু রংজিকে কখনো কখনো সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তুলনাটি তাঁর দক্ষতা বোঝাতে সহায়ক হলেও ব্যাপ্তির দিক থেকে তা যথেষ্ট নয়। লি কুয়ান ইউ একটি ছোট রাষ্ট্রকে রূপান্তরিত করেছিলেন; ঝু রংজি এমন এক দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যার জনসংখ্যা ছিল বিশ্বের মোট মানুষের বিশাল একটি অংশ।
এই পরিবর্তনের প্রভাব তাই চীনের সীমানায় আটকে থাকেনি।
চীনের শিল্পায়ন বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা বদলে দিয়েছে। বিপুল উৎপাদনক্ষমতা সারা বিশ্বের বাজারে পণ্যের দাম ও প্রাপ্যতার ওপর প্রভাব ফেলেছে। গত ২৫ বছরে যে বিপুলসংখ্যক ভোক্তা তুলনামূলক কম দামে নানা ধরনের পণ্য পেয়েছেন, তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে চীনের এই অর্থনৈতিক রূপান্তর গভীরভাবে যুক্ত।
এই বাস্তবতার পেছনে ঝু রংজির ভূমিকা আজ তাঁর মৃত্যুর পর নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে।

একটি অসম্পূর্ণ কিন্তু বিশাল উত্তরাধিকার
ঝু রংজিকে কেবল একজন কঠোর সংস্কারক হিসেবে স্মরণ করলে তাঁর গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তিনি ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি অর্থনৈতিক সংস্কারের মানবিক মূল্য বুঝতেন এবং একই সঙ্গে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা থেকেও পিছিয়ে যাননি।
তাঁর সিদ্ধান্তের অনেকগুলো ছিল কঠিন, বিতর্কিত এবং বহু মানুষের জন্য বেদনাদায়ক। কিন্তু সেগুলোর মধ্য দিয়েই চীনের অর্থনৈতিক কাঠামো এমনভাবে বদলেছিল, যা পরবর্তী কয়েক দশকের বৈশ্বিক অর্থনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাওয়া আমার জন্য ছিল বিরল সৌভাগ্য। তিনি ছিলেন আমার পরামর্শদাতা, আবার বন্ধুও। তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়গুলো আমাকে বুঝিয়েছে, ইতিহাসের বড় ব্যক্তিত্বদের শুধু তাঁদের সরকারি পরিচয় বা রাজনৈতিক উত্তরাধিকার দিয়ে বিচার করা যায় না।
ঝু রংজির গল্প তাই একই সঙ্গে একটি দেশের অর্থনৈতিক উত্থানের গল্প এবং একজন মানুষের গল্প—যিনি নিজের কাজের বিশালতা নিয়ে হয়তো খুব বেশি কথা বলতে চাইতেন না, কিন্তু যাঁর সিদ্ধান্তের প্রভাব তাঁর জীবনকালের চেয়েও অনেক দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।
চীনের অর্থনৈতিক বিস্ময়ের পেছনে তাঁর অবদান ইতিহাসে যথেষ্ট গুরুত্বেই লেখা থাকবে। তবে তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় সম্ভবত তাঁর অর্জনের তালিকা নয়; বরং বোঝা যে সেই পরিবর্তনের পেছনে ছিল এক কঠিন, ক্লান্তিকর এবং গভীরভাবে মানবিক দায়িত্ববোধ।
আন্দ্রে দেসমারাইস 


















