রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ব্যক্তিগত চিন্তা একসময় থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ভাবনা থেকে সরে এসেছেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, দেশের মানুষ ও দলীয় নেতা-কর্মীদের এই সময়ে ছেড়ে বিশ্রামে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
নয়াদিল্লি থেকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকেই তিনি মানুষের দুর্দিনে পাশে থাকার শিক্ষা পেয়েছেন। ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই তার পরিবারে পরিণত হয়েছিলেন। তাই আজ যখন দলের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন সংকটে রয়েছেন এবং দেশের মানুষ নানা সমস্যার মুখোমুখি, তখন অবসরে যাওয়ার চিন্তা তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
অবসরের ভাবনা কেন এসেছিল
শেখ হাসিনার অবসর নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের এক বক্তব্যের পর। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জয়ের মন্তব্য তার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত অনুভূতিরই প্রতিফলন ছিল। তিনি বহুবার নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন এবং আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক কাউন্সিলগুলোতেও তরুণদের সামনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত জীবনে তার আর বিশেষ কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। তবে বর্তমান বাস্তবতা তাকে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দাবি করেন, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ স্বাভাবিক নয়। তিনি অভিযোগ করেন, গণতন্ত্র সংকটের মুখে পড়েছে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের অনেকে কারাগারে বা ঘরছাড়া অবস্থায় রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে, শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা চলছে। তার মতে, রাষ্ট্রকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে বিচ্যুত করার প্রচেষ্টা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো সম্ভব নয় বলেই তিনি মনে করেন।
ক্ষমতার নয়, দায়িত্বের প্রশ্ন
শেখ হাসিনা স্পষ্টভাবে বলেন, তার লক্ষ্য ক্ষমতায় ফেরা নয়; বরং জনগণের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালন করা। তিনি জানান, দেশের মানুষের নিরাপত্তা, উন্নত জীবনমান, অর্থনৈতিক মুক্তি, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও সমঅধিকার নিশ্চিত হওয়ার পর এবং দলীয়ভাবে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরই তিনি অবসর নিয়ে ভাববেন।
তার মতে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও সেই দায়িত্বের অংশ।

নেতৃত্ব নির্বাচন হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়
দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সম্পত্তি নয়। নেতৃত্ব নির্ধারিত হবে দলের কাউন্সিল, কর্মীদের মতামত, ত্যাগ, যোগ্যতা, সাহস এবং আদর্শিক অবস্থানের ভিত্তিতে।
তিনি বলেন, নেতৃত্ব কোনো অলঙ্কার নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য অবদান রাখা প্রবীণ নেতাদের অভিজ্ঞতাকেও তিনি দলের মূল্যবান সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তরুণ নেতৃত্বের ওপর আস্থা
শেখ হাসিনা জানান, দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরলে নতুন কাউন্সিলের মাধ্যমে দলকে আরও শক্তিশালী করা হবে। সেই প্রক্রিয়ায় মেধাবী, দেশপ্রেমিক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তরুণদের সামনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, কঠিন পরিস্থিতিতেও যারা দলের পতাকা ধরে রেখেছেন, তারাই ভবিষ্যতের নেতৃত্বের ভিত্তি।
ফেরার প্রত্যয়
বাংলাদেশে ফিরে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে শেখ হাসিনা বলেন, অতীতে বিভিন্ন শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না।
তার মতে, নিজের দেশে ফিরে আসার বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। তিনি দাবি করেন, জনগণ আওয়ামী লীগের ওপর আস্থা রাখে এবং সেই জনগণের শক্তিকে ভিত্তি করেই তিনি দেশে ফিরবেন। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও দেশ পুনর্গঠনের প্রত্যয় নিয়েই তার প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্য।
শেখ হাসিনার অবসর না নেওয়ার ঘোষণা
শেখ হাসিনা বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অবসরের চিন্তা বাদ দিয়ে জনগণ ও দলীয় নেতা-কর্মীদের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















