নড়াইল জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। ফলে সহকারী শিক্ষকদের অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, যা সরাসরি শ্রেণিকক্ষের পাঠদানে প্রভাব ফেলছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৪৯৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৮০টিই বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। অর্থাৎ প্রায় ৫৭ শতাংশ বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই।
প্রধান শিক্ষক সংকটে শিক্ষা কার্যক্রমে চাপ
নড়াইল সদর উপজেলার শেখহাটি ইউনিয়নের ডিএসবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এ সংকটের একটি উদাহরণ। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৭৪ সালে জাতীয়করণ হওয়া বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ১৩২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে গত দুই বছর ধরে সেখানে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই।
বর্তমানে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাহমুদা পারভীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানান, প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হওয়ায় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠ গ্রহণের ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
একই বিদ্যালয়ের আরেক সহকারী শিক্ষক সোনিয়া খানম বলেন, প্রশাসনিক কাজের কারণে অনেক সময় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের বিদ্যালয়ের বাইরে থাকতে হয়। শিক্ষকসংখ্যা সীমিত থাকায় একসঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্ব ও পাঠদান চালিয়ে যাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
সহকারী শিক্ষক সংকটও বাড়াচ্ছে সমস্যা
জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শুধু প্রধান শিক্ষকই নয়, সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য রয়েছে। এতে অনেক বিদ্যালয়কে প্রয়োজনের তুলনায় কম শিক্ষক নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।
নড়াইল সদর উপজেলার তুলারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কৃপা শিকদার ২০১৮ সাল থেকে এই দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করলেও তিনি এখনও সহকারী শিক্ষকের বেতন পান। পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত রয়েছেন।
তার মতে, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেও প্রাপ্য সুবিধা না পাওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
প্রশাসনিক কাজের চাপে কমছে পাঠদানের সময়
শিক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের একদিকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে হয়, অন্যদিকে বিদ্যালয়ের নথিপত্র সংরক্ষণ, সরকারি প্রতিবেদন অনলাইনে জমা দেওয়া, সভা সমন্বয় এবং অফিস ব্যবস্থাপনার মতো নানা দায়িত্বও পালন করতে হয়।
বিশেষ করে শিক্ষকস্বল্পতায় ভোগা বিদ্যালয়গুলোতে এসব অতিরিক্ত দায়িত্বের কারণে শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
অভিভাবকদের উদ্বেগ
অভিভাবকদের মতে, একটি বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলেন প্রধান শিক্ষক। দীর্ঘদিন পদ শূন্য থাকলে বিদ্যালয়ের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়ে। এর প্রভাব শিক্ষার মানের ওপরও পড়ে এবং শিক্ষকরা অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়েন।
সমাধানের আশ্বাস
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম শিক্ষকসংকটজনিত সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, আপাতত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। শূন্য পদগুলোর বিষয়টি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আইনি জটিলতার কারণেই অনেক পদ দীর্ঘদিন খালি রয়েছে। তবে সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
#নড়াইল #প্রাথমিকশিক্ষা #প্রধানশিক্ষকসংকট #সরকারিপ্রাথমিকবিদ্যালয় #শিক্ষাব্যবস্থা #বাংলাদেশশিক্ষা #নড়াইলসংবাদ #শিক্ষাখাত
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















