আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ প্রশাসন নিকোবারি আদিবাসী সম্প্রদায়ের স্বশাসন ব্যবস্থায় আনুষ্ঠানিক নির্বাচন চালুর পরিকল্পনা করেছে। এই প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে নিকোবরের বিভিন্ন আদিবাসী পরিষদে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রদায়ের অনেক নেতা আশঙ্কা করছেন, নতুন নিয়ম তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যগত শাসনব্যবস্থাকে আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে বেঁধে ফেলতে পারে।
খসড়া নিয়মে কী প্রস্তাব করা হয়েছে?
২০২৬ সালের ১৫ মে আন্দামান ও নিকোবর প্রশাসন ‘ট্রাইবাল কাউন্সিলস (প্রিপারেশন অব ইলেক্টোরাল রোলস অ্যান্ড কন্ডাক্ট অব ইলেকশনস) রুলস’ নামে একটি খসড়া বিধিমালা প্রকাশ করে। এতে গ্রাম পরিষদ ও ট্রাইবাল কাউন্সিলে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচন আয়োজনের বিস্তারিত পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় প্রতিটি গ্রামের বাসিন্দারা সরাসরি ভোট দিয়ে পাঁচ থেকে নয়জন ক্যাপ্টেন নির্বাচন করবেন। একই সঙ্গে প্রতিটি দ্বীপের ট্রাইবাল কাউন্সিলের প্রধান ক্যাপ্টেনও সরাসরি নির্বাচিত হবেন। এছাড়া প্রথম ক্যাপ্টেনরা ভোট দিয়ে ভাইস-চিফ ক্যাপ্টেন নির্বাচন করবেন। নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ, ভোটার তালিকা প্রস্তুত, প্রার্থিতা, মনোনয়ন, আসন সংরক্ষণ এবং প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কেও বিধান রাখা হয়েছে।
বর্তমান ব্যবস্থায় কীভাবে পরিচালিত হয় ট্রাইবাল কাউন্সিল?
প্রায় ৩০ হাজার জনসংখ্যার নিকোবারি জনগোষ্ঠী কয়েক দশক ধরে নিজস্ব ট্রাইবাল কাউন্সিলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রতিটি গ্রামে সাধারণত তিনজন ক্যাপ্টেন থাকেন—প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ক্যাপ্টেন। বিভিন্ন দ্বীপে মোট সাতটি ট্রাইবাল কাউন্সিল এই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে।
গবেষকদের মতে, অন্তত ১৯৭০-এর দশক থেকে নিকোবারিরা প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে গ্রাম ক্যাপ্টেন নির্বাচন করে আসছেন। তবে এসব নির্বাচন কঠোর আইনি কাঠামোর মধ্যে নয়; বরং সম্প্রদায়ভিত্তিক ঐকমত্য ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল।
বর্তমানে নেতা নির্বাচন কীভাবে হয়?
নিকোবারের অনেক এলাকায় নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে নির্বাচন হয় না। যখন সম্প্রদায় মনে করে নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়েছে, তখন গ্রামের সবাইকে নিয়ে সভা ডাকা হয়। সভায় প্রার্থীদের নাম প্রস্তাব করা হয় এবং পরে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন সম্পন্ন হয়। ভোটপত্র তৈরি থেকে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া স্থানীয়রাই পরিচালনা করেন।
নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষার মাত্রা, হিন্দি ভাষায় দক্ষতা, বাইরের বিশ্বের অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের সক্ষমতাকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। তবে নির্বাচিত ক্যাপ্টেনরা একক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নন; সাধারণত সম্প্রদায়ের সঙ্গে পরামর্শ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নতুন প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ কেন?
অনেক আদিবাসী নেতা মনে করছেন, নতুন নির্বাচনী ব্যবস্থা তাদের ঐতিহ্যগত শাসনপদ্ধতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের মতে, বর্তমান ব্যবস্থা সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আনুষ্ঠানিক নির্বাচন, ভোটার তালিকা, প্রশাসনিক নিয়ম ও নিয়মিত নির্বাচনী প্রক্রিয়া তাদের দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিক কাঠামোকে বদলে দিতে পারে।
কিছু পর্যবেক্ষক আরও মনে করছেন, গ্রেট নিকোবর দ্বীপে কেন্দ্রীয় সরকারের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের বিরোধিতার প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ রাজনৈতিক তাৎপর্যও বহন করতে পারে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন কোনো উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়নি।
পরবর্তী পদক্ষেপ কী?
আন্দামান ও নিকোবর প্রশাসনের ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার বিভাগ জানিয়েছে, ১৫ জুন পর্যন্ত খসড়া বিধিমালার ওপর আপত্তি ও পরামর্শ গ্রহণ করা হবে। এরপর চূড়ান্ত বিধিমালা প্রকাশ করা হতে পারে। ইতোমধ্যে স্থানীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব খসড়া বিধিমালার বিরোধিতা করে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, নিকোবারি সমাজের ঐতিহ্যবাহী ‘তুহেত’ সামাজিক কাঠামোকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এবং সম্প্রদায়ের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শ ছাড়াই এই খসড়া তৈরি করা হয়েছে।-
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















