ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় আবারও রাস্তায় নেমেছেন শত শত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর ব্যয় অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারা দাবি করেছেন, সরকারের ব্যয়বহুল কর্মসূচিগুলো দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার সক্ষমতাকে দুর্বল করছে।
‘#MenujuIndonesiaBangkrut’ বা ‘দেউলিয়ার পথে ইন্দোনেশিয়া’ শিরোনামে আয়োজিত এই বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন। এর মধ্যে ছিল সরকারি অপচয় কমানো, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হ্রাস, এবং সরকারের বহুল আলোচিত বিনামূল্যের পুষ্টিকর খাবার ও ‘রেড অ্যান্ড হোয়াইট কো-অপারেটিভস’ কর্মসূচি বন্ধ করার আহ্বান।
রাজধানীতে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি
শুক্রবার বিকেলে ইন্দোনেশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, আইপিবি ইউনিভার্সিটি, জাকার্তা স্টেট পলিটেকনিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা শহরের গুরুত্বপূর্ণ এইচআই ট্রাফিক সার্কেলের দিকে অগ্রসর হন। তবে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর ব্যারিকেড তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধা দেয়।
কিছু বিক্ষোভকারীকে সেনায়ান আইনসভা কমপ্লেক্সে সমাবেশ করার পরামর্শ দেওয়া হলেও তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগ উভয়ই জনগণের স্বার্থ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং তারা আর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না।
সামরিক উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
বিক্ষোভকারীদের অন্যতম দাবি ছিল বেসামরিক বিষয়গুলোতে সামরিক সম্পৃক্ততা বন্ধ করা। সমাবেশ ঘিরে চার হাজারের বেশি নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়, যার মধ্যে প্রায় ৫০০ সেনাসদস্য ছিলেন।
জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকা ও প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের আশপাশে সামরিক যান, কৌশলগত সরঞ্জাম এবং সেনা সদস্যদের উপস্থিতি শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তোলে। তাদের মতে, এই পরিস্থিতি বেসামরিক পরিসরে সামরিক প্রভাব বৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করছে।
অর্থনৈতিক চাপ ও জনদুর্ভোগের প্রসঙ্গ
বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, দেশের সাধারণ মানুষ ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। তাদের অভিযোগ, সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে বিশেষ কিছু কর্মসূচির পেছনে, অথচ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো এখনও যথাযথভাবে সমাধান হয়নি।

তারা প্রেসিডেন্ট প্রাবোওর প্রতি নিজের ভুল স্বীকার এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সংঘর্ষের আশঙ্কা ও গ্রেপ্তার
দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কয়েকজন বিক্ষোভকারী পুলিশি ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেন এবং নিরাপত্তা সদস্যদের দিকে বোতলসহ বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। তবে শেষ পর্যন্ত তারা নিরাপত্তা বলয় অতিক্রম করতে পারেননি।
পুলিশের দাবি, কিছু ব্যক্তি বিশৃঙ্খলা তৈরির উদ্দেশ্যে সমাবেশে অংশ নিয়েছিল এবং তাদের কাছে মলোটভ ককটেল থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় দুইজনকে আটক করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিক্ষোভ আয়োজকদের বিরুদ্ধে পূর্বানুমতি ছাড়া সমাবেশ করার অভিযোগও আনা হয়েছে, যদিও শিক্ষার্থী নেতারা সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সরকারের প্রতিক্রিয়া
সরকারি কর্মকর্তারা শিক্ষার্থীদের দাবিকে গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় বলা হয়েছে, সরকার সমালোচনা গ্রহণে প্রস্তুত, তবে জাতীয় ঐক্য রক্ষা এবং ভুল তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে এবং পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে আন্দোলন
জাকার্তার পাশাপাশি বান্দুং, সেমারাং এবং সুরাবায়াসহ বিভিন্ন বড় শহরেও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। আন্দোলনকারীরা রুপিয়ার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পার্তামিনার বাণিজ্যিক শাখা সম্প্রতি ভর্তুকিবিহীন জ্বালানির দাম প্রায় ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধিও জনঅসন্তোষকে আরও তীব্র করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ইন্দোনেশিয়ার শিক্ষার্থীরা এর আগে সরকারকে ১৮ দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছিল। তাদের সতর্কবার্তা ছিল, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে দেশব্যাপী আরও বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















