দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন, অবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক মতবিরোধের পর ন্যাটোর সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক আবারও নতুন মাত্রা পাচ্ছে। একসময় যে জোটকে নিয়ে দেশটির জনমনে ব্যাপক সংশয় ছিল, এখন সেই ন্যাটোকেই তুরস্ক তার নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছে। আগামী ৭ জুলাই ন্যাটো সম্মেলনের আয়োজক দেশ হিসেবে তুরস্কের ভূমিকা এই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
জনমতের পরিবর্তন
শীতল যুদ্ধের সময়ও ন্যাটো তুরস্কে খুব জনপ্রিয় ছিল না। বিশেষ করে ২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টার পর আঙ্কারা অভিযোগ করেছিল, পশ্চিমা দেশগুলো তুরস্কের প্রতি যথেষ্ট সমর্থন দেখায়নি। সেই সময় প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং তার সরকারের বিভিন্ন নেতা পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি বদলেছে। নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, তুরস্কের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাগরিক এখন দেশের নিরাপত্তার জন্য ন্যাটোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং ইউক্রেন যুদ্ধ তুরস্কের কাছে জোটটির কৌশলগত গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে।
নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার
সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কে ন্যাটোর সামরিক উপস্থিতি বেড়েছে। দেশটিতে ইতোমধ্যে ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ও রাডার ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলে নতুন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ অঞ্চলে নতুন বহুজাতিক সামরিক সদরদপ্তর স্থাপনের কাজও এগোচ্ছে।
এই পদক্ষেপগুলো তুরস্কের জন্য শুধু প্রতিরক্ষা নিরাপত্তাই নয়, বরং জোটের ভেতরে তার গুরুত্বও বাড়িয়ে তুলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি
আঙ্কারা ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কেও ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমানোর সিদ্ধান্ত তুরস্ককে স্বস্তি দিয়েছে। একই সঙ্গে বহুদিন ধরে ঝুলে থাকা আধুনিক যুদ্ধবিমান সরবরাহের বিষয়েও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কয়েক বছর আগে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার কারণে দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। তবে বর্তমানে উভয় পক্ষই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

ইউরোপের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ তুরস্ক
ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তুরস্কের ভূমিকা দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইউক্রেন ও রাশিয়ার বাইরে ইউরোপের বড় এবং যুদ্ধ-অভিজ্ঞ সেনাবাহিনীগুলোর মধ্যে তুরস্ক অন্যতম। কৃষ্ণসাগরে প্রবেশপথ বসফরাস প্রণালীর নিয়ন্ত্রণও দেশটির হাতে।
এ ছাড়া তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। ড্রোন, প্রশিক্ষণ বিমান এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম এখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ফলে সামরিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই তুরস্কের গুরুত্ব বাড়ছে।
সম্পর্কের উষ্ণতা, কিন্তু সব সমস্যা শেষ নয়
ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হলেও সব মতবিরোধ দূর হয়নি। তুরস্ক এখনও মনে করে, তার দক্ষিণ সীমান্তের নিরাপত্তা উদ্বেগকে জোট যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। অন্যদিকে ইউরোপের অনেক দেশ এখনও সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের ন্যাটো সদস্যপদ নিয়ে তুরস্কের দীর্ঘ বিলম্বকে ভালোভাবে দেখেনি।
রাশিয়া সম্পর্কেও দুই পক্ষের অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে। ইউরোপ যেখানে রাশিয়াকে প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে, তুরস্ক তুলনামূলকভাবে আরও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করে আসছে।
রাশিয়া থেকে ধীরে ধীরে দূরত্ব
তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে তুরস্কের অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল হয়েছে। সিরিয়ায়ও আগের তুলনায় তুরস্কের প্রভাব বেড়েছে। দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলেও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।
এসব পরিবর্তনের ফলে আঙ্কারা এখন আগের তুলনায় ন্যাটো ও পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। ফলে তুরস্ককে ঘিরে নতুন এক ভূরাজনৈতিক সমীকরণ গড়ে উঠছে, যা আগামী বছরগুলোতে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















