জীববিজ্ঞান ও প্রকৌশলের সমন্বয়ে তৈরি নতুন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক জৈব অর্থনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে নতুন একটি সিনথেটিক জীববিজ্ঞান গবেষণাগার চালু করেছে সিঙ্গাপুর। পরিবেশবান্ধব প্রসাধনী, সাশ্রয়ী টিকা এবং জৈব জ্বালানিসহ নানা ধরনের পণ্য উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী টেকসই রাসায়নিক ও জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকায় সিনথেটিক জীববিজ্ঞানের বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে ৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৮০ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই সম্ভাবনাময় বাজারে অংশীদারিত্ব বাড়াতেই নতুন গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেছে দেশটি।
জীবন্ত কোষকে কারখানায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগ
নতুন গবেষণাগারের মূল লক্ষ্য হলো জিনগতভাবে উন্নত খামির ও ছত্রাককে ‘কোষ কারখানা’ হিসেবে ব্যবহার করা। এসব জীবাণু সাধারণ পুষ্টি উপাদানকে জটিল অণুতে রূপান্তর করতে সক্ষম, যা পরে টিকা, জৈব জ্বালানি এবং অন্যান্য মূল্যবান উপাদান তৈরিতে ব্যবহার করা যাবে।
গবেষকরা বলছেন, এর মাধ্যমে এমন অনেক উপাদান ও রাসায়নিক উৎপাদন সম্ভব হবে, যেগুলো আগে অত্যন্ত ব্যয়বহুল বা প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করা যেত না।
গবেষণা ও শিল্পের মধ্যে সেতুবন্ধন
১১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া এই গবেষণাগারটি দেশের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগ। এখানে মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে জৈব উপাদান চাষ ও পরিবর্তনের দক্ষতাকে একত্রিত করা হবে।
গবেষণাগারের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো গবেষণাগারভিত্তিক আবিষ্কারকে দ্রুত শিল্প পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। ফলে নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন সহজে বাজারে পৌঁছাতে পারবে।
টিকার উপাদান উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য
গবেষণাগারের নেতৃত্বে থাকা বিজ্ঞানীরা আগে এমন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যার মাধ্যমে খামির ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ টিকা উপাদান উৎপাদন সম্ভব হয়েছে।
সাধারণত এই উপাদান উদ্ভিদ থেকে সংগ্রহ করতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। এক কিলোগ্রাম উপাদান সংগ্রহে যেখানে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি খরচ হতে পারে, সেখানে খামির ব্যবহার করে একই পরিমাণ উপাদান মাত্র ২০০ ডলারের কাছাকাছি খরচে উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে।
এতে শুধু ব্যয়ই কমেনি, পরিবেশের ওপর চাপও কমেছে। উদ্ভিদ থেকে রাসায়নিক ব্যবহার করে উপাদান আহরণের প্রয়োজনও অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় দ্রুত গবেষণা
নতুন গবেষণাগারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন অণু নকশা করা হবে। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে জীববৈজ্ঞানিক প্রকৌশল কার্যক্রমের বড় অংশই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা পরিচালিত হতে পারে।
যন্ত্রশিক্ষণ ও জৈব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নতুন পণ্য উদ্ভাবনের সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। ফলে গবেষণা থেকে বাজারে পণ্য পৌঁছানোর প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হবে।
ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী তৈরির পরিকল্পনা
গবেষণাগারটি শুধু গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এখানে ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও থাকবে। যৌথ তত্ত্বাবধান, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং গবেষণা ফেলোশিপের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে সিনথেটিক জীববিজ্ঞান ও বিপাকীয় প্রকৌশল বিষয়ে দক্ষ করে তোলা হবে।
নতুন শিল্পবিপ্লবের সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, নবায়নযোগ্য জৈব সম্পদ ব্যবহার করে খাদ্য, জ্বালানি ও শিল্পপণ্য উৎপাদনের যে অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠছে, সেটিই জৈব অর্থনীতি। এটি আগামী দিনের শিল্প উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টেকসই উন্নয়নকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই খাত শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়, পরিবেশগত ক্ষতি কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সিঙ্গাপুরের নতুন গবেষণাগার সেই পরিবর্তনের অগ্রভাগে থাকার লক্ষ্য নিয়েই যাত্রা শুরু করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















