ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে অনুভূত হতে শুরু করেছে যুক্তরাজ্যে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দেশটির অর্থনীতি আট মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো সংকুচিত হয়েছে। এতে সরকারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে, একই সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
অর্থনীতিতে ধীরগতির ইঙ্গিত
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে যুক্তরাজ্যের মোট দেশজ উৎপাদন শূন্য দশমিক এক শতাংশ কমেছে। গত দুই মাসে প্রবৃদ্ধি থাকলেও এবার সেই ধারা ভেঙে গেছে। ২০২৫ সালের আগস্টের পর এই প্রথম অর্থনীতি সংকোচনের মুখে পড়ল।
বিশেষ করে সেবা খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ খাতের উৎপাদন শূন্য দশমিক দুই শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে নির্মাণ খাতে সামান্য প্রবৃদ্ধি এবং উৎপাদন শিল্পে কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও তা সামগ্রিক পতন ঠেকাতে পারেনি।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সরাসরি প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন বাতিল হওয়ায় যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়ে। পর্যটন, ভ্রমণ সংস্থা, পরিবহন, গুদামজাতকরণ এবং আতিথেয়তা খাতের আয় কমে যায়।
শিল্প ও বিনোদন খাতেও বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। ক্রীড়া ও বিনোদন সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। খুচরা বিক্রিও কমেছে, যা ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জ্বালানি ব্যয় বাড়ার প্রভাব
যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে জ্বালানির দাম এবং ঋণের খরচ বেড়েছে। উচ্চ ব্যয়ের চাপে পরিবারগুলো অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে আনছে। খাদ্য ছাড়া প্রায় সব ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে ভোক্তা ব্যয় কমে গেছে।
অনেক পরিবার জ্বালানি ব্যয়ের সম্ভাব্য বৃদ্ধির জন্য আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর প্রভাব গাড়ি ব্যবহার থেকে শুরু করে পোশাক ও গৃহস্থালি পণ্যের কেনাকাটাতেও দেখা যাচ্ছে।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বাড়তি চাপ
যুদ্ধজনিত অনিশ্চয়তার পাশাপাশি দেশীয় বিভিন্ন সমস্যাও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কর বৃদ্ধি, ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো এবং শ্রম ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি চাপের মুখে রয়েছে।
একই সময়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে কর্মী ছাঁটাইয়ের পথ বেছে নিচ্ছে। ফলে শ্রমবাজারেও চাপ বাড়ছে।
সুদের হার নিয়ে দ্বিধা
অর্থনীতির এই দুর্বল অবস্থার মধ্যে নীতিনির্ধারকদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে দুর্বল চাহিদা। ফলে সুদের হার বাড়ানো হবে নাকি বর্তমান অবস্থায় রাখা হবে, তা নিয়ে সতর্ক অবস্থান দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজনীতিতেও বাড়ছে অনিশ্চয়তা
অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে হতাশাজনক ফলাফলের পর প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অর্থনীতি ও রাজনীতির এই দ্বৈত চাপ আগামী মাসগুলোতে যুক্তরাজ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















