বিশ্বকাপ মানেই আর্জেন্টিনায় ফুটবল উন্মাদনা। তবে এবার সেই উন্মাদনা শুধু মাঠ বা টেলিভিশনের পর্দায় সীমাবদ্ধ নেই। দেশজুড়ে শিশু-কিশোরদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বকাপ স্টিকার সংগ্রহ ও বিনিময়ের এক ব্যতিক্রমী জ্বর, যা অনেককে সাময়িকভাবে হলেও দূরে সরিয়ে দিয়েছে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই রাজধানী বুয়েনস আইরেসসহ বিভিন্ন শহরে দেখা গেছে স্কুল, পার্ক, শপিং এলাকা এবং খোলা মাঠে শিশুদের ভিড়। তাদের হাতে স্মার্টফোন নয়, বরং খেলোয়াড়দের ছবি সম্বলিত স্টিকারের প্যাকেট ও অ্যালবাম। লক্ষ্য একটাই—বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সব দলের সব খেলোয়াড়ের ছবি দিয়ে অ্যালবাম পূর্ণ করা।
স্টিকার বিনিময়ে জমে উঠছে সামাজিক যোগাযোগ

শিশুরা দল বেঁধে একে অপরের সঙ্গে স্টিকার বিনিময় করছে। কেউ খুঁজছে প্রিয় খেলোয়াড়ের ছবি, কেউ আবার নির্দিষ্ট দেশের ফুটবলারদের স্টিকার। প্রয়োজনীয় স্টিকার পাওয়ার জন্য চলে দর-কষাকষি, কৌশল আর উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা।
অনেক শিশু নিজের হাতে কাগজে লিখে রাখছে কোন কোন স্টিকার এখনও সংগ্রহ করা বাকি। নতুন স্টিকার পাওয়ার আনন্দে তাদের উচ্ছ্বাস যেন ফুটবল ম্যাচ জয়ের সমান।
অভিভাবকদের অনেকেই বলছেন, এই অভিজ্ঞতা তাদের শৈশবের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। একই সঙ্গে তারা খুশি যে সন্তানরা কিছু সময়ের জন্য হলেও মোবাইলের পর্দা ছেড়ে বাস্তব জগতে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে।
ডিজিটাল যুগেও টিকে আছে পুরোনো আনন্দ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল বিনোদনের বিস্ফোরণের মধ্যেও স্টিকার সংগ্রহের আকর্ষণ হারিয়ে যায়নি। বরং বিশ্বকাপের মতো বড় আয়োজন সেই আগ্রহকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে।

একটি স্টিকারের প্যাকেট খুলে ভেতরে কী আছে তা দেখার কৌতূহল আজও আগের মতোই রয়ে গেছে। অজানার সেই আনন্দই শিশুদের বারবার আকৃষ্ট করছে।
ফুটবল ইতিহাস ও সংগ্রহশালার গবেষকদের মতে, কয়েক দশক ধরে আর্জেন্টিনায় বিশ্বকাপ স্টিকার সংগ্রহ একটি পারিবারিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। একসময় যেসব অ্যালবাম বাবা-মা বা দাদা-দাদিরা সংগ্রহ করতেন, আজ সেই একই আনন্দ উপভোগ করছে নতুন প্রজন্ম।
মোবাইল আসক্তির বিপরীতে এক স্বস্তির ছবি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশু-কিশোরদের মধ্যে অতিরিক্ত পর্দা ব্যবহারের বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেন, সন্তানদের মোবাইল বা ভিডিও দেখার অভ্যাস কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ অবস্থায় স্টিকার সংগ্রহের এই প্রবণতা অনেকের কাছে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এমনকি যেসব শিশু আগে ফুটবলে বিশেষ আগ্রহ দেখাত না, তারাও এখন ম্যাচ দেখছে এবং খেলোয়াড়দের সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হচ্ছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, এটি হয়তো স্থায়ী সমাধান নয়, কিন্তু শিশুদের মুখোমুখি যোগাযোগ, বন্ধুত্ব এবং সামাজিক অংশগ্রহণের গুরুত্ব আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও উচ্ছ্বাস
দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি সত্ত্বেও বহু পরিবার চেষ্টা করছে সন্তানদের এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত না করতে। অনেক অভিভাবক বাড়তি কাজ করে হলেও স্টিকারের প্যাকেট কিনে দিচ্ছেন।
তাদের বিশ্বাস, বিশ্বকাপের এই কয়েক সপ্তাহের আনন্দ শিশুদের জন্য বিশেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে। আর সেই আনন্দের বড় অংশ জুড়ে আছে একটি ছোট স্টিকার প্যাকেট খুলে অজানা ছবির অপেক্ষা।
আর্জেন্টিনায় তাই বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি হয়ে উঠেছে প্রজন্মকে একত্রে যুক্ত করার উৎসব। ডিজিটাল যুগেও কাগজের ছোট্ট স্টিকার যে মানুষের মধ্যে সম্পর্ক, আনন্দ ও উত্তেজনা তৈরি করতে পারে, তারই প্রমাণ মিলছে দেশজুড়ে।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















