১১:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
স্পেসএক্সের ২ ট্রিলিয়ন ডলারের উত্থান: মঙ্গল স্বপ্ন থেকে মহাকাশ সাম্রাজ্য ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কে টানাপোড়েন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে অস্বস্তিতে ইসরায়েল চীনের চাপেও পিছু হটবে না নেদারল্যান্ডস, ইন্দো-প্যাসিফিকে সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত রাখার ঘোষণা ডিজিটাল চুক্তির যুগে ট্রাম্প-ইরান সমঝোতা: শান্তির পথে অগ্রগতি নাকি অনিশ্চয়তার নতুন ফাঁদ? জন্মেছেন এমপি সাহেব ১৯৮১ সালে, অথচ পিতা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ! নিরীক্ষার খাঁচায় বিশ্ববিদ্যালয়: উৎকর্ষের নামে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার সংকট ইরানের তেল বাজারে ফেরার ইঙ্গিতে কমল তেলের দাম, নজর এখন নতুন ফেড প্রধানের দিকে ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল, অর্ধেকের বেশি অর্থায়ন আগেই নিশ্চিত মেসির হ্যাটট্রিকে বিশ্বকাপ ইতিহাসে ক্লোসের রেকর্ড স্পর্শ, আর্জেন্টিনার স্মরণীয় জয় নতুন বাস্তবতা: তেলের যুগ কি চাহিদার সীমায় পৌঁছে গেছে?

নিরীক্ষার খাঁচায় বিশ্ববিদ্যালয়: উৎকর্ষের নামে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার সংকট

এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়কে সমাজের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে দেখা হতো। কারণ সেখানেই জন্ম নিত প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্ন করার সাহস, ক্ষমতার বিরুদ্ধে সমালোচনার ভাষা এবং নতুন চিন্তার বীজ। আজ সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ জ্ঞানচর্চার মান নয়, বরং তারা কোনো মূল্যায়ন বা স্বীকৃতি প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ হতে পারবে কি না। এই পরিবর্তন শুধু প্রশাসনিক নয়; এটি উচ্চশিক্ষার মৌলিক চরিত্রকেই পুনর্গঠন করছে।

এশিয়াসহ বিশ্বের বহু দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমশ বিভিন্ন মাননিয়ন্ত্রণ ও স্বীকৃতি কাঠামোর দিকে ঝুঁকছে। এসব প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং আধুনিকায়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। ফলে শিক্ষকদের সময় ব্যয় হচ্ছে নথি প্রস্তুত, সূচক নির্ধারণ, ফলাফল মানচিত্রায়ন এবং মূল্যায়নের জন্য প্রমাণ তৈরিতে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভেতরে গড়ে উঠছে নতুন নতুন কাঠামো, যাদের প্রধান কাজ হচ্ছে নিরীক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তুত রাখা।

সমস্যা কেবল কোনো নির্দিষ্ট ডিগ্রি প্রোগ্রামের মূল্যায়নে সীমাবদ্ধ নেই। এখন পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কেই একটি প্রশাসনিক যন্ত্র হিসেবে বিচার করা হচ্ছে। কৌশলগত পরিকল্পনা, শাসনব্যবস্থা, তথ্য ব্যবস্থাপনা, কর্মসম্পাদন সূচক, অংশীজন সম্পৃক্ততা এবং ধারাবাহিক উন্নয়নের প্রক্রিয়া—সবকিছু পরিমাপ ও যাচাইয়ের আওতায় আসছে। ফলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহণযোগ্যতা ক্রমশ নির্ভর করছে তার বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের ওপর নয়, বরং কতটা সুসংগঠিতভাবে সে নিজের কার্যক্রমকে নথিবদ্ধ করতে পারে তার ওপর।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া দরকার: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান পরিচয় কী? এটি কি মূলত জ্ঞান, বিতর্ক ও সমালোচনামূলক চিন্তার কেন্দ্র, নাকি দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার একটি মডেল?

অবশ্যই জবাবদিহি বা মাননিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। জনসম্পদ ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ হতে হবে। শিক্ষার মান যাচাই, পাঠক্রম মূল্যায়ন কিংবা প্রতিষ্ঠানগত উন্নয়নের উদ্যোগও জরুরি। কিন্তু যখন এসব প্রক্রিয়া নিজেই উদ্দেশ্যে পরিণত হয়, তখন সমস্যা শুরু হয়।

এই অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রবিন্দু থেকে জ্ঞানচর্চা সরে যেতে থাকে। শিক্ষক ও গবেষকদের কাজ হয়ে দাঁড়ায় নিজেদের কাজের প্রমাণ তৈরি করা। ভালো পড়ানো যথেষ্ট নয়; প্রমাণ করতে হবে যে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী ভালো পড়ানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখানো, প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা বা সমাজসংশ্লিষ্ট গবেষণা পরিচালনা করা আর যথেষ্ট নয়; তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে অসংখ্য সূচক, টেমপ্লেট এবং মূল্যায়ন কাঠামো।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজসমূহে ডিপ্লোমাধারীদের উচ্চশিক্ষা

ধীরে ধীরে একটি নতুন ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্থান ঘটে—যাকে বলা যেতে পারে ‘কমপ্লায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়’। এখানে যা মাপা যায়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। যা সংখ্যায় প্রকাশ করা যায় না, তার মূল্য কমে যায়। সমালোচনামূলক চিন্তা, বৌদ্ধিক সাহস, নৈতিক অবস্থান, রাজনৈতিক প্রশ্ন কিংবা সামাজিক সম্পৃক্ততার মতো বিষয়গুলো প্রশাসনিক ভাষায় ধরা কঠিন। ফলে সেগুলো প্রান্তিক হয়ে পড়ে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানবসভ্যতার সবচেয়ে প্রভাবশালী চিন্তাগুলো কোনো নিরীক্ষা-নির্ভর পরিবেশে জন্ম নেয়নি। নতুন ধারণা সাধারণত অনিশ্চয়তা, বিতর্ক, ঝুঁকি এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর থেকেই আসে। বড় চিন্তার জন্য প্রয়োজন এমন এক পরিবেশ, যেখানে ব্যর্থ হওয়ার স্বাধীনতা আছে, ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ আছে এবং সবকিছু পূর্বনির্ধারিত কাঠামোয় আবদ্ধ নয়।

প্রতিষ্ঠানগত মূল্যায়নের বিস্তার তাই আরও গভীরভাবে ভাবার দাবি রাখে। কারণ এটি শুধু শিক্ষার মান যাচাই করে না; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাসন ও সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করে। এতে কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাপনা উৎসাহিত হয়, স্বতঃস্ফূর্ততার পরিবর্তে প্রাধান্য পায় নিয়ন্ত্রণ, আর সৃজনশীল বিশৃঙ্খলার জায়গা দখল করে নেয় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা।

বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। এসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয় কেবল দক্ষ কর্মী তৈরির কারখানা নয়। তারা সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, গণতান্ত্রিক সংকট এবং উন্নয়নের প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাদের কাজ শুধু বাজারের জন্য মানবসম্পদ তৈরি করা নয়; বরং সমাজকে নিজেকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করা। বিশ্ববিদ্যালয়কে একদিকে যেমন ঐকমত্য গঠনে ভূমিকা রাখতে হয়, অন্যদিকে তেমনি প্রয়োজন হলে ভিন্নমতেরও জন্ম দিতে হয়।

কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও র‍্যাঙ্কিংয়ের প্রতিযোগিতায় অনেক প্রতিষ্ঠান এমন এক পথে হাঁটছে, যেখানে বাহ্যিক সাফল্য অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে আড়াল করে ফেলছে। কাগজে-কলমে তারা আরও সুশৃঙ্খল, আরও দক্ষ এবং আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে; কিন্তু একই সঙ্গে হারিয়ে ফেলছে প্রশ্ন করার সাহস, নতুন চিন্তার ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা এবং প্রতিষ্ঠিত কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা।

এই কারণে মাননিয়ন্ত্রণকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করার প্রয়োজন নেই, বরং তার সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। মূল্যায়ন ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়কে সহায়তা করবে—শাসন করবে না। প্রশাসনিক কাঠামো জ্ঞানচর্চার অনুগত হবে—তার বিকল্প নয়। যদি সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়, তাহলে আমরা হয়তো এমন বিশ্ববিদ্যালয় পাব, যারা সব ধরনের নিরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হবে, কিন্তু সমাজকে নাড়া দেওয়ার মতো কোনো চিন্তা আর উৎপাদন করতে পারবে না।

উচ্চশিক্ষার জন্য এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কী হতে পারে? একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখন সব কাগুজে পরীক্ষায় পাস করবে, অথচ তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি—বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা—নিঃশব্দে বিলীন হয়ে যাবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

স্পেসএক্সের ২ ট্রিলিয়ন ডলারের উত্থান: মঙ্গল স্বপ্ন থেকে মহাকাশ সাম্রাজ্য

নিরীক্ষার খাঁচায় বিশ্ববিদ্যালয়: উৎকর্ষের নামে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার সংকট

১০:০০:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়কে সমাজের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে দেখা হতো। কারণ সেখানেই জন্ম নিত প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্ন করার সাহস, ক্ষমতার বিরুদ্ধে সমালোচনার ভাষা এবং নতুন চিন্তার বীজ। আজ সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ জ্ঞানচর্চার মান নয়, বরং তারা কোনো মূল্যায়ন বা স্বীকৃতি প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ হতে পারবে কি না। এই পরিবর্তন শুধু প্রশাসনিক নয়; এটি উচ্চশিক্ষার মৌলিক চরিত্রকেই পুনর্গঠন করছে।

এশিয়াসহ বিশ্বের বহু দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমশ বিভিন্ন মাননিয়ন্ত্রণ ও স্বীকৃতি কাঠামোর দিকে ঝুঁকছে। এসব প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং আধুনিকায়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। ফলে শিক্ষকদের সময় ব্যয় হচ্ছে নথি প্রস্তুত, সূচক নির্ধারণ, ফলাফল মানচিত্রায়ন এবং মূল্যায়নের জন্য প্রমাণ তৈরিতে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভেতরে গড়ে উঠছে নতুন নতুন কাঠামো, যাদের প্রধান কাজ হচ্ছে নিরীক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তুত রাখা।

সমস্যা কেবল কোনো নির্দিষ্ট ডিগ্রি প্রোগ্রামের মূল্যায়নে সীমাবদ্ধ নেই। এখন পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কেই একটি প্রশাসনিক যন্ত্র হিসেবে বিচার করা হচ্ছে। কৌশলগত পরিকল্পনা, শাসনব্যবস্থা, তথ্য ব্যবস্থাপনা, কর্মসম্পাদন সূচক, অংশীজন সম্পৃক্ততা এবং ধারাবাহিক উন্নয়নের প্রক্রিয়া—সবকিছু পরিমাপ ও যাচাইয়ের আওতায় আসছে। ফলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহণযোগ্যতা ক্রমশ নির্ভর করছে তার বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের ওপর নয়, বরং কতটা সুসংগঠিতভাবে সে নিজের কার্যক্রমকে নথিবদ্ধ করতে পারে তার ওপর।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া দরকার: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান পরিচয় কী? এটি কি মূলত জ্ঞান, বিতর্ক ও সমালোচনামূলক চিন্তার কেন্দ্র, নাকি দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার একটি মডেল?

অবশ্যই জবাবদিহি বা মাননিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। জনসম্পদ ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ হতে হবে। শিক্ষার মান যাচাই, পাঠক্রম মূল্যায়ন কিংবা প্রতিষ্ঠানগত উন্নয়নের উদ্যোগও জরুরি। কিন্তু যখন এসব প্রক্রিয়া নিজেই উদ্দেশ্যে পরিণত হয়, তখন সমস্যা শুরু হয়।

এই অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রবিন্দু থেকে জ্ঞানচর্চা সরে যেতে থাকে। শিক্ষক ও গবেষকদের কাজ হয়ে দাঁড়ায় নিজেদের কাজের প্রমাণ তৈরি করা। ভালো পড়ানো যথেষ্ট নয়; প্রমাণ করতে হবে যে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী ভালো পড়ানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখানো, প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা বা সমাজসংশ্লিষ্ট গবেষণা পরিচালনা করা আর যথেষ্ট নয়; তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে অসংখ্য সূচক, টেমপ্লেট এবং মূল্যায়ন কাঠামো।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজসমূহে ডিপ্লোমাধারীদের উচ্চশিক্ষা

ধীরে ধীরে একটি নতুন ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্থান ঘটে—যাকে বলা যেতে পারে ‘কমপ্লায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়’। এখানে যা মাপা যায়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। যা সংখ্যায় প্রকাশ করা যায় না, তার মূল্য কমে যায়। সমালোচনামূলক চিন্তা, বৌদ্ধিক সাহস, নৈতিক অবস্থান, রাজনৈতিক প্রশ্ন কিংবা সামাজিক সম্পৃক্ততার মতো বিষয়গুলো প্রশাসনিক ভাষায় ধরা কঠিন। ফলে সেগুলো প্রান্তিক হয়ে পড়ে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানবসভ্যতার সবচেয়ে প্রভাবশালী চিন্তাগুলো কোনো নিরীক্ষা-নির্ভর পরিবেশে জন্ম নেয়নি। নতুন ধারণা সাধারণত অনিশ্চয়তা, বিতর্ক, ঝুঁকি এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর থেকেই আসে। বড় চিন্তার জন্য প্রয়োজন এমন এক পরিবেশ, যেখানে ব্যর্থ হওয়ার স্বাধীনতা আছে, ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ আছে এবং সবকিছু পূর্বনির্ধারিত কাঠামোয় আবদ্ধ নয়।

প্রতিষ্ঠানগত মূল্যায়নের বিস্তার তাই আরও গভীরভাবে ভাবার দাবি রাখে। কারণ এটি শুধু শিক্ষার মান যাচাই করে না; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাসন ও সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করে। এতে কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাপনা উৎসাহিত হয়, স্বতঃস্ফূর্ততার পরিবর্তে প্রাধান্য পায় নিয়ন্ত্রণ, আর সৃজনশীল বিশৃঙ্খলার জায়গা দখল করে নেয় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা।

বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। এসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয় কেবল দক্ষ কর্মী তৈরির কারখানা নয়। তারা সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, গণতান্ত্রিক সংকট এবং উন্নয়নের প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাদের কাজ শুধু বাজারের জন্য মানবসম্পদ তৈরি করা নয়; বরং সমাজকে নিজেকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করা। বিশ্ববিদ্যালয়কে একদিকে যেমন ঐকমত্য গঠনে ভূমিকা রাখতে হয়, অন্যদিকে তেমনি প্রয়োজন হলে ভিন্নমতেরও জন্ম দিতে হয়।

কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও র‍্যাঙ্কিংয়ের প্রতিযোগিতায় অনেক প্রতিষ্ঠান এমন এক পথে হাঁটছে, যেখানে বাহ্যিক সাফল্য অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে আড়াল করে ফেলছে। কাগজে-কলমে তারা আরও সুশৃঙ্খল, আরও দক্ষ এবং আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে; কিন্তু একই সঙ্গে হারিয়ে ফেলছে প্রশ্ন করার সাহস, নতুন চিন্তার ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা এবং প্রতিষ্ঠিত কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা।

এই কারণে মাননিয়ন্ত্রণকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করার প্রয়োজন নেই, বরং তার সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। মূল্যায়ন ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়কে সহায়তা করবে—শাসন করবে না। প্রশাসনিক কাঠামো জ্ঞানচর্চার অনুগত হবে—তার বিকল্প নয়। যদি সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়, তাহলে আমরা হয়তো এমন বিশ্ববিদ্যালয় পাব, যারা সব ধরনের নিরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হবে, কিন্তু সমাজকে নাড়া দেওয়ার মতো কোনো চিন্তা আর উৎপাদন করতে পারবে না।

উচ্চশিক্ষার জন্য এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কী হতে পারে? একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখন সব কাগুজে পরীক্ষায় পাস করবে, অথচ তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি—বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা—নিঃশব্দে বিলীন হয়ে যাবে।