মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা শুধু জ্বালানি বাজারেই অস্থিরতা তৈরি করেনি, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ পরিস্থিতিকেও নতুন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তেল, গ্যাস ও খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে যে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে, তা এখন অনেক দেশের জন্য ‘ঋণ ধাক্কা’ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকটের শিকড় রয়েছে গত দশকের স্বল্প সুদের যুগে। তখন অনেক নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ ডলারে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়। সেই অর্থের একটি বড় অংশ অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বেড়েছিল। কিন্তু মহামারির পর বৈশ্বিক সুদের হার দ্রুত বাড়তে শুরু করে এবং ডলারের মূল্য শক্তিশালী হওয়ায় সেই ঋণের বোঝা বহুগুণ বেড়ে যায়।
ঋণের বোঝায় নুয়ে পড়ছে বহু দেশ
২০২৩ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়ায় প্রায় ১১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে। এটি তাদের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় সমান। একই সময়ে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। বিশ্বের বহু দেশ এখন তাদের জাতীয় বাজেটের বড় অংশ শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয় করছে।

পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়েছে যে অনেক দেশে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক খাতের চেয়ে ঋণ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। এর ফলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
নতুন সংকট জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তেল ও গ্যাস আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে। জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাদের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন ঋণ নেওয়ার খরচও বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের হিসাবে, বর্তমানে বেশ কয়েকটি দেশ সরাসরি ঋণ সংকটে রয়েছে এবং আরও বহু দেশ উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে আছে। অনেক সরকারকে ঋণ খেলাপি হওয়া ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সমাধানে প্রয়োজন দ্রুত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। জরুরি অর্থায়ন বাড়ানো, উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ জোরদার করা এবং ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দ্রুত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

একই সঙ্গে ‘ঋণ বিনিময়’ বা ডেট সোয়াপের মতো নতুন ধারণাও গুরুত্ব পাচ্ছে। এর আওতায় কোনো দেশ উন্নয়ন, জলবায়ু অভিযোজন, স্বাস্থ্য বা শিক্ষায় বিনিয়োগের শর্তে নতুন অর্থায়নের সুযোগ পেতে পারে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বড় সংকটের সময় সাময়িকভাবে ঋণ পরিশোধ স্থগিত রাখার ব্যবস্থাও আলোচনায় রয়েছে।
উন্নয়ন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে অনেক দেশ সরাসরি ঋণ খেলাপি না হলেও উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
করোনা মহামারির সময় যেভাবে সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, বর্তমান সংকটেও তেমন সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ এই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সেইসব দেশ, যারা মূল সমস্যার জন্য দায়ী নয়। তাই বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















