০৭:৩৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কারাগার যখন রাজনৈতিক অস্ত্র: রাশিয়ায় ভয় ও নীরবতার রাজনীতি জাতিসংঘ অধিবেশনে গাজা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আহ্বান পাকিস্তানের থার্ড পার্টি অ্যাপ হ্যাক করে বিগকমার্সের ক্রেতাদের তথ্য ফাঁস ইসলামাবাদে পিটিআই নেতাদের বাড়িতে অভিযানের অভিযোগ, এসএসপিকে তলব হাইকোর্টের পোলিও টিকাদান দলের নিরাপত্তায় হামলা, বেলুচিস্তানে ২ পুলিশ সদস্য নিহত ইরান-যুক্তরাষ্ট্রে আবারও আলোচনার ইঙ্গিত, জাতিসংঘ অধিবেশনকে ‘সোনালি সুযোগ’ বলছে তেহরান সিঁড়ি ভাঙার এই সহজ অভ্যাসই বাড়াতে পারে আয়ু, বলছেন চিকিৎসকেরা বিগ ফার্মার প্রবৃদ্ধির সংকট, সমাধান হতে পারে ঝুঁকিপূর্ণ অধিগ্রহণ ইয়েমেনের হুথিদের চাপে সৌদি আরব: তেলের পথ থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি শরীর নিয়ে অসন্তুষ্টি নয়, নিজেকে ভালোবাসার ১০ উপায়

চীনের ছায়ায় মিয়ানমার: শক্তিশালী হচ্ছে জান্তা, বাড়ছে বেইজিংয়ের প্রভাব

মিয়ানমারের সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইংয়ের বেইজিং সফর দেশটির চলমান রাজনৈতিক সংকট ও গৃহযুদ্ধের মধ্যে নতুন বার্তা দিয়েছে। দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে থাকা জান্তা নেতৃত্ব এখন ধীরে ধীরে কূটনৈতিক স্বীকৃতি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে, আর সেই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় সহায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদায় মিন অং হ্লাইংকে বেইজিংয়ে স্বাগত জানানো হয়। এই নির্বাচনকে বিরোধী দলবিহীন ও সামরিক বাহিনীর প্রভাবাধীন বলে সমালোচনা করা হলেও চীন প্রকাশ্যে তার প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছে। এর আগে ভারত সফরেও একই ধরনের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেয়েছিলেন তিনি।

গৃহযুদ্ধে জান্তার অবস্থান শক্তিশালী

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমার গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। একসময় দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো দ্রুত অগ্রসর হলেও গত এক বছরে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ কর্মসূচির ফলে সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং তারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

Xi: China 'firmly supports' Myanmar in safeguarding sovereignty

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি শহরে সামরিক বাহিনী অগ্রসর হয়েছে। সীমান্তবর্তী বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর দিকেও তাদের নজর বাড়ছে, যা অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের কৌশলগত স্বার্থ

মিয়ানমারে চীনের আগ্রহ কেবল রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও ভূ-কৌশলগতও। দেশটি চীনের জন্য ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এর মাধ্যমে বেইজিং মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়।

চীন বর্তমানে মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী। জ্বালানি, অবকাঠামো, বন্দর, রেলপথ ও সীমান্ত বাণিজ্যে তাদের বড় অংশীদারিত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘে কূটনৈতিক সহায়তা, সামরিক প্রযুক্তি ও বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমেও জান্তা সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে।

দুর্লভ খনিজ নিয়ে বাড়ছে গুরুত্ব

মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চল বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ভারী বিরল মাটির খনিজের অন্যতম উৎস। বৈদ্যুতিক যানবাহন, স্যাটেলাইট ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত এসব খনিজের বৈশ্বিক সরবরাহে দেশটির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Satellite images show surge in rare earth mining in rebel-held Myanmar

এই খনিজের বড় অংশ বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে উত্তোলন করা হলেও তা শেষ পর্যন্ত চীনে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। ফলে জান্তা সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী—উভয় পক্ষই চীনা বাজার ও বাণিজ্যপথের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে মিয়ানমারের প্রায় সব শক্তির কেন্দ্রের ওপরই বেইজিংয়ের প্রভাব বজায় রয়েছে।

শুধু অর্থনীতি নয়, তথ্য প্রবাহেও প্রভাব

চীনের প্রভাব এখন শুধু বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ নেই। দেশটি মিয়ানমার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক তথ্যপ্রবাহ ও গবেষণার ক্ষেত্রেও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারবিষয়ক এক বিশিষ্ট গবেষককে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আটক করার ঘটনা আন্তর্জাতিক গবেষক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারে চীনের লক্ষ্য পুরো দেশকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়। বরং এমন একটি পরিস্থিতি বজায় রাখা, যেখানে জান্তা, বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং সীমান্ত অঞ্চলের সব পক্ষকেই কোনো না কোনোভাবে বেইজিংয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হবে।

ফলে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যত অনিশ্চিতই হোক না কেন, একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্যে চীনের প্রভাব এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি এবং সেই প্রভাবের বিকল্পও আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

কারাগার যখন রাজনৈতিক অস্ত্র: রাশিয়ায় ভয় ও নীরবতার রাজনীতি

চীনের ছায়ায় মিয়ানমার: শক্তিশালী হচ্ছে জান্তা, বাড়ছে বেইজিংয়ের প্রভাব

১১:৩৭:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

মিয়ানমারের সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইংয়ের বেইজিং সফর দেশটির চলমান রাজনৈতিক সংকট ও গৃহযুদ্ধের মধ্যে নতুন বার্তা দিয়েছে। দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে থাকা জান্তা নেতৃত্ব এখন ধীরে ধীরে কূটনৈতিক স্বীকৃতি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে, আর সেই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় সহায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদায় মিন অং হ্লাইংকে বেইজিংয়ে স্বাগত জানানো হয়। এই নির্বাচনকে বিরোধী দলবিহীন ও সামরিক বাহিনীর প্রভাবাধীন বলে সমালোচনা করা হলেও চীন প্রকাশ্যে তার প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছে। এর আগে ভারত সফরেও একই ধরনের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেয়েছিলেন তিনি।

গৃহযুদ্ধে জান্তার অবস্থান শক্তিশালী

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমার গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। একসময় দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো দ্রুত অগ্রসর হলেও গত এক বছরে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ কর্মসূচির ফলে সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং তারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

Xi: China 'firmly supports' Myanmar in safeguarding sovereignty

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি শহরে সামরিক বাহিনী অগ্রসর হয়েছে। সীমান্তবর্তী বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর দিকেও তাদের নজর বাড়ছে, যা অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের কৌশলগত স্বার্থ

মিয়ানমারে চীনের আগ্রহ কেবল রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও ভূ-কৌশলগতও। দেশটি চীনের জন্য ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এর মাধ্যমে বেইজিং মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়।

চীন বর্তমানে মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী। জ্বালানি, অবকাঠামো, বন্দর, রেলপথ ও সীমান্ত বাণিজ্যে তাদের বড় অংশীদারিত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘে কূটনৈতিক সহায়তা, সামরিক প্রযুক্তি ও বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমেও জান্তা সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে।

দুর্লভ খনিজ নিয়ে বাড়ছে গুরুত্ব

মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চল বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ভারী বিরল মাটির খনিজের অন্যতম উৎস। বৈদ্যুতিক যানবাহন, স্যাটেলাইট ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত এসব খনিজের বৈশ্বিক সরবরাহে দেশটির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Satellite images show surge in rare earth mining in rebel-held Myanmar

এই খনিজের বড় অংশ বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে উত্তোলন করা হলেও তা শেষ পর্যন্ত চীনে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। ফলে জান্তা সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী—উভয় পক্ষই চীনা বাজার ও বাণিজ্যপথের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে মিয়ানমারের প্রায় সব শক্তির কেন্দ্রের ওপরই বেইজিংয়ের প্রভাব বজায় রয়েছে।

শুধু অর্থনীতি নয়, তথ্য প্রবাহেও প্রভাব

চীনের প্রভাব এখন শুধু বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ নেই। দেশটি মিয়ানমার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক তথ্যপ্রবাহ ও গবেষণার ক্ষেত্রেও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারবিষয়ক এক বিশিষ্ট গবেষককে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আটক করার ঘটনা আন্তর্জাতিক গবেষক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারে চীনের লক্ষ্য পুরো দেশকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়। বরং এমন একটি পরিস্থিতি বজায় রাখা, যেখানে জান্তা, বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং সীমান্ত অঞ্চলের সব পক্ষকেই কোনো না কোনোভাবে বেইজিংয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হবে।

ফলে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যত অনিশ্চিতই হোক না কেন, একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্যে চীনের প্রভাব এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি এবং সেই প্রভাবের বিকল্পও আপাতত দেখা যাচ্ছে না।