টানা পাঁচ সপ্তাহের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধে জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বলিভিয়ায় ৯০ দিনের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ। শনিবার ঘোষিত এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সড়ক অবরোধ সরাতে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে সেনাবাহিনীকে বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক রাজধানী লা পাজসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে জ্বালানি ও খাদ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা পাজ সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন নীতি, বিশেষ করে জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহারের প্রতিবাদে তার পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

সংঘর্ষে হতাহত ও গ্রেপ্তার
বিক্ষোভ চলাকালে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ৩৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৩৭ জন আহত হয়েছেন।
এদিকে পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ায় অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে বলিভিয়ার ওমবাডসম্যান কার্যালয় ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। সরকারের দাবি, সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় অন্তত সাতজন প্রাণ হারিয়েছেন।

লা পাজ কার্যত বিচ্ছিন্ন
দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোতে অবরোধের কারণে লা পাজ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জ্বালানি ও খাদ্যের সরবরাহ কমে গেছে, পরিবহন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছে এবং রোগীদের চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতির প্রভাবে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। সুপারমার্কেটের তাক খালি হয়ে পড়েছে এবং হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন সংকটের খবরও পাওয়া গেছে। ফলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দাবিতে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে।
জরুরি অবস্থার আওতায় কী থাকছে
টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট পাজ বলেন, জরুরি অবস্থার উদ্দেশ্য মানুষের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা।
সরকারি ডিক্রিতে সড়ক, মহাসড়ক ও রাস্তায় এমন সব অবরোধ নিষিদ্ধ করা হয়েছে যা পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করে। একই সঙ্গে পুলিশকে সহায়তা, সড়ক পুনরায় চালু করা এবং সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষায় সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে সরকার বলেছে, এই জরুরি অবস্থার কারণে সাংবিধানিক অধিকার বা আইনি প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তা স্থগিত করা হচ্ছে না। পরিস্থিতির উন্নতি হলে নির্ধারিত সময়ের আগেই জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া হতে পারে।

অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক চাপ
গত নভেম্বরে ক্ষমতায় আসেন মধ্যপন্থী নেতা রদ্রিগো পাজ। প্রায় দুই দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা বামপন্থী মুভমেন্ট টুওয়ার্ড সোশ্যালিজম (এমএএস) দলের শাসনের অবসান ঘটিয়ে তিনি দায়িত্ব নেন। তবে তিনি এমন এক সময় ক্ষমতায় আসেন, যখন দেশটি প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি।
দীর্ঘদিনের জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে জনঅসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। নিম্নমানের পেট্রোল সরবরাহের সরকারি উদ্যোগও সমালোচনার জন্ম দেয়, কারণ এতে হাজারো যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ ওঠে।
বর্তমান আন্দোলনের বড় অংশে অংশ নিচ্ছে আদিবাসী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, যারা আগে এমএএসকে সমর্থন করলেও গত বছর পাজকে ক্ষমতায় আনতে ভূমিকা রেখেছিল। তাদের অভিযোগ, সরকার তাদের উদ্বেগ ও দাবি উপেক্ষা করছে।
আন্তর্জাতিক সমর্থন ও বিরোধিতা
প্রেসিডেন্ট পাজ একদিকে কংগ্রেসে প্রভাবশালী কট্টর ডানপন্থী বিরোধী শিবিরের চাপের মুখে রয়েছেন, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের বামপন্থী শক্তির বিরোধিতাও মোকাবিলা করছেন।
সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং নতুন নির্বাচনের দাবি তুলেছেন। বর্তমানে তিনি ধর্ষণ-সংক্রান্ত মামলার অভিযোগে গ্রেপ্তার এড়াতে দেশের কোকা উৎপাদন অঞ্চলে আত্মগোপনে রয়েছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে পাজ সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি বলিভিয়ার নেতার সঙ্গে কথা বলে জরুরি সহায়তা ও সরবরাহ সহায়তা বাড়ানোর আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বিক্ষোভকে বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
বলিভিয়ায় সড়ক অবরোধ ঘিরে জ্বালানি ও খাদ্য সংকটের মধ্যে প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ ৯০ দিনের জরুরি অবস্থা জারি করেছেন।
#বলিভিয়া #জরুরি_অবস্থা #রদ্রিগো_পাজ #সড়ক_অবরোধ #জ্বালানি_সংকট #খাদ্য_সংকট #লা_পাজ #ইভো_মোরালেস #বিশ্বসংবাদ #সারাক্ষণ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















