বিশ্ব আবহাওয়াবিদদের নতুন পূর্বাভাসে আশঙ্কা করা হচ্ছে, সামনে আসা এল নিনো সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোর একটি হতে পারে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ খরা, বন্যা, তাপপ্রবাহ এবং খাদ্যসংকটের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ২০২৭ সাল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে।
এল নিনো কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
শত শত বছর আগে পেরুর জেলেরা প্রশান্ত মহাসাগরে মাছের অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন। পরে এই ঘটনাই ‘এল নিনো’ নামে পরিচিত হয়। বর্তমানে এটি এমন একটি বৈশ্বিক জলবায়ুগত ঘটনা হিসেবে বিবেচিত, যা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়াকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
এল নিনোর সময় পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত উষ্ণতা বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে দেয়। কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা, কোথাও আবার দীর্ঘস্থায়ী খরার সৃষ্টি হয়।

রেকর্ড ভাঙার আশঙ্কা
বিশ্বের বিভিন্ন আবহাওয়া মডেলের পূর্বাভাস বলছে, চলতি বছরের শেষ ভাগ এবং ২০২৭ সালের শুরুর দিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হতে পারে। গত ৭৫ বছরের পর্যবেক্ষণে এমন শক্তিশালী উষ্ণতার নজির খুবই বিরল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি বাস্তবে ঘটলে এটি অতীতের শক্তিশালী এল নিনো ঘটনাগুলোকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর প্রভাব বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রাকে আরও ওপরে ঠেলে দেবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে দ্বিগুণ ঝুঁকি
এল নিনো নিজে জলবায়ু পরিবর্তনের ফল নয়। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এর প্রভাব আরও তীব্র হয়ে ওঠে। অতীতে শক্তিশালী এল নিনোর পর বিশ্বে নতুন নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। এর ওপর শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হলে ২০২৭ সালে নতুন বৈশ্বিক উষ্ণতার রেকর্ড গড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে যেসব অঞ্চল
পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং ওশেনিয়ার বহু দেশ অতীতে এল নিনোর কারণে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। খরা ও ফসলহানির কারণে লাখো মানুষ খাদ্যসংকটে পড়েছে এবং অনেককে বাসস্থান ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হতে হয়েছে।
বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকা ও সাহেল অঞ্চলে নতুন করে তীব্র খরার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পূর্ব আফ্রিকার কিছু দেশে আবার খরার পর আকস্মিক ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। দীর্ঘ সময় শুকনো থাকার পর মাটির পানি শোষণক্ষমতা কমে যাওয়ায় এমন বৃষ্টি আরও বেশি ক্ষতির কারণ হতে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্বের অনেক অঞ্চল ইতোমধ্যে যুদ্ধ, দারিদ্র্য এবং খাদ্যসংকটের চাপে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন এল নিনো কৃষি উৎপাদনকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা এখন থেকেই খরা-সহনশীল ফসল চাষ, পশুখাদ্য সংরক্ষণ এবং জরুরি খাদ্য মজুতের মতো প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন।
তাদের মতে, সম্ভাব্য মানবিক সংকট এড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কারণ এল নিনোর প্রভাব শুরু হওয়ার পর নয়, বরং আগেই প্রস্তুতি গ্রহণ করলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















