পর্দার আড়ালে থাকা দেহরক্ষীদের কাজ নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। তবে একজন পেশাদার দেহরক্ষীর দায়িত্ব যে শুধু ভিআইপি বা তারকাকে ঘিরে রাখা নয়, বরং তাদের নিরাপত্তা, সুনাম এবং মূল্যবান সম্পদ রক্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত—সেই বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাকর্মী উইলিয়াম তজেনের অভিজ্ঞতায়।
অর্ধেক জীবন কেটেছে নিরাপত্তা পেশায়
৪৮ বছর বয়সী তজেন প্রায় ২৪ বছর ধরে দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করছেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেন। পরে বেসরকারি নিরাপত্তা খাতে যোগ দিয়ে করপোরেট প্রধান, আন্তর্জাতিক তারকা এবং ধনকুবেরদের সুরক্ষার দায়িত্ব নেন।
তার দায়িত্বে ছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন পরিচিত মুখ। তবে পেশাদারিত্বের কারণে তারকাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করা বা ছবি তোলার মতো বিষয়কে তিনি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বলে মনে করেন। তার ভাষায়, একজন দেহরক্ষীকে কখনোই আবেগপ্রবণ হওয়া চলবে না।
তারকা নিরাপত্তায় থাকে দীর্ঘ পরিকল্পনা

কোনো তারকা বিমানবন্দরে নামার আগেই শুরু হয়ে যায় নিরাপত্তা পরিকল্পনা। তারা কোন ফ্লাইটে আসছেন, কোথায় থাকবেন, কীভাবে চলাফেরা করবেন—সবকিছু আগেভাগেই বিশ্লেষণ করা হয়।
অনেক সময় ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকাদের যাত্রার তথ্য জেনে বিমানবন্দর কিংবা হোটেলে ভিড় জমায়। এমন পরিস্থিতিতে দেহরক্ষীদের সবচেয়ে বড় কাজ হলো বিশৃঙ্খলা এড়ানো এবং নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।
তজেন জানান, অনেক তারকা ব্যক্তিগত সময় কাটাতে চান। কেউ হয়তো হোটেলের জিমে যেতে চান বা ব্যক্তিগত বৈঠক করতে চান। সেক্ষেত্রেও নিরাপত্তা দল কাছাকাছি অবস্থান করে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকে।
শক্তির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল
দেহরক্ষীদের প্রশিক্ষণের বড় অংশজুড়ে থাকে নিরস্ত্র আত্মরক্ষা, সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকি শনাক্ত করার কৌশল। তবে কোনো পরিস্থিতিতেই অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগকে উৎসাহ দেওয়া হয় না।
তজেনের মতে, একজন আক্রমণকারীকে পরাস্ত করা নয়, বরং দ্রুত নিরাপদ স্থানে ক্লায়েন্টকে সরিয়ে নেওয়াই মূল লক্ষ্য। শারীরিক হস্তক্ষেপ সবসময় শেষ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়।
গহনা নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ
তারকা নিরাপত্তার পাশাপাশি বর্তমানে বিলাসবহুল গহনার নিরাপত্তাও বড় দায়িত্ব হয়ে উঠেছে। তজেন ও তার দল বহু মূল্যবান গহনা প্রদর্শনী এবং ব্যক্তিগত বিক্রয় অনুষ্ঠানে কাজ করেছেন।

তিনি জানান, সবচেয়ে ব্যয়বহুল যে গহনাটি তিনি পাহারা দিয়েছেন, তার মূল্য ছিল প্রায় ২৬৮ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার সমপরিমাণ। এমন গহনার ক্ষেত্রে শুধু চুরি নয়, দুর্ঘটনাবশত পড়ে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও সমান গুরুত্ব পায়।
কখনো কখনো একটি প্রদর্শনীতে মডেলদের শরীরে থাকা দুই ডজনেরও বেশি গহনার হিসাব একসঙ্গে রাখতে হয় নিরাপত্তা দলকে।
দেহরক্ষীর সবচেয়ে বড় অস্ত্র কী?
অভিজ্ঞ এই নিরাপত্তাকর্মীর মতে, আধুনিক দেহরক্ষীর সবচেয়ে বড় অস্ত্র আগ্নেয়াস্ত্র নয়, বরং বিচক্ষণতা, ধৈর্য এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা।
বর্তমানে তাকে প্রায়ই হোটেল কর্তৃপক্ষ, চালক, অনুষ্ঠান আয়োজক, তারকা ব্যবস্থাপক এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। সামান্য ভুলও বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
কঠিন দায়িত্ব, কম ঘুম
একটি বড় দায়িত্ব পালনের সময় অনেক ক্ষেত্রে দিনে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ মেলে। দীর্ঘ সময়ের চাপ, সতর্কতা এবং সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই শেষ করতে হয় প্রতিটি মিশন।
তবে সবকিছু সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর তারকাদের কৃতজ্ঞতা এবং নিরাপদে দায়িত্ব শেষ করার অনুভূতিই তাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।




















