০২:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
হাইলাইট: হাকিমপুরে সামান্য বৃষ্টিতেই বেহাল সড়ক, দুই গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ সময়ের দূরত্বে পিতাকে নতুন করে আবিষ্কার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যথেষ্ট নয়, দরকার পেশাগত ন্যায়বিচারের কাঠামো একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু নীতিতে নয়, সন্তান পালনের গল্পেও নির্ধারিত হয় এত বিপুল সংখ্যক শিশুমৃত্যু বাংলাদেশ আগে কখনও দেখেনি কেপ ভার্দের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে, উরুগুয়ের বিপক্ষেও চমক দেখাতে প্রস্তুত ব্লু শার্কস বাবার নীরব ভালোবাসা: স্মৃতি, ত্যাগ আর অটুট বন্ধনের গল্প চালকের উদ্বেগ কমিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে ঝড় তুলেছে প্রোটন বাবার অসমান পায়ের পথচলার ঋণ শোধে জীবন উৎসর্গ মেয়ের বাবার ভালোবাসা সব সময় বলা হয় না, কখনও কখনও তা শুধু ত্যাগেই লেখা থাকে

বাবার অসমান পায়ের পথচলার ঋণ শোধে জীবন উৎসর্গ মেয়ের

বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়া থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত—সবকিছুই আজও স্পষ্ট মনে আছে সালিনাহ অ্যাডেলিনাহ আবদুল্লাহর। শৈশবে যে বাবা প্রতিদিন কষ্ট করে তাকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন, আজ সেই অসুস্থ বাবার সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন তিনি। বাবার প্রতি এক মেয়ের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের গল্প অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে।

স্বপ্ন ছেড়ে বাবার পাশে

সালিনাহর জীবনে ত্যাগের শুরু অনেক আগেই। একসময় তার স্বপ্ন ছিল বিমানবাহিনীতে যোগ দেওয়ার। কিন্তু পরিবারের দায়িত্বের কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। পরে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তার পালক মায়ের মৃত্যু হলে পরিস্থিতি আরও বদলে যায়।

এর কিছুদিন আগে স্ট্রোক ও স্নায়বিক জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তার ৭০ বছর বয়সী পালক বাবা আহমদ মোহাম্মদ তাহির। একাধিকবার খিঁচুনি এবং সংকটজনক অবস্থার কারণে তাকে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে কোমায় রাখা হয়েছিল।

To earn a living, Salinah Adelinah Abdullah   hosts live broadcasts on social media to sell homemade sambal, often with her father by her side.

সেই সময় চিকিৎসকেরা পরিবারের সদস্যদের ডেকে নেওয়ার পর সালিনাহ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—বাবা সুস্থ হয়ে ফিরলে তিনি চাকরি ছেড়ে তার দেখাশোনা করবেন। পরে বাবা সুস্থ হয়ে জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর তিনি নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন।

বৃষ্টিতে ভিজেও অপেক্ষা করতেন বাবা

সালিনাহ জানান, তার বাবার জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ছিল। একটি পা অন্যটির তুলনায় ছোট হওয়ায় হাঁটতে কষ্ট হতো। কিন্তু মেয়ের জন্য কোনো বাধাই তাকে থামাতে পারেনি।

মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকে প্রতিদিন মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন তিনি। স্কুলে নামিয়ে দিয়ে কাছের একটি ছোট্ট ছাউনিতে বসে অপেক্ষা করতেন। বৃষ্টির দিনে ছাউনির ফুটো দিয়ে পানি পড়ে জামাকাপড় ভিজে যেত, গরমের দিনে ঘামে ভিজে থাকতেন। তবুও কখনও অনুপস্থিত থাকতেন না।

স্কুল শেষে আবার মেয়ের হাত ধরে প্রায় সাত কিলোমিটার পথ হেঁটে বাড়ি ফিরতেন। বৃষ্টি এলে নিজের কাছে থাকা প্লাস্টিক দিয়ে মেয়ের মাথা ঢেকে দিতেন, কিন্তু নিজের কথা ভাবতেন না।

অভাবের সংসারে সন্তানের স্বপ্ন পূরণ

শৈশবের সবচেয়ে স্মরণীয় স্মৃতিগুলোর একটি হলো বাবার কিনে দেওয়া সাইকেল। আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও মেয়ের ইচ্ছা পূরণে কঠোর পরিশ্রম করতেন তিনি।

বরফ বিক্রি করে যে সামান্য আয় হতো, তার প্রায় পুরোটাই জমাতেন মেয়ের জন্য। সেই অর্থ দিয়ে কিনেছিলেন সাইকেল, দিয়েছিলেন শিক্ষাসফরসহ নানা প্রয়োজনের খরচ। নিজের জন্য তিনি প্রায় কিছুই ব্যয় করতেন না।

Stepping up for the father who walked her home [WATCH]

এখন মেয়েই বাবার ভরসা

বর্তমানে আহমদ মোহাম্মদ তাহির শয্যাশায়ী। পিত্তথলি এবং ক্ষতিগ্রস্ত অন্ত্রের একটি অংশ অপসারণের বড় অস্ত্রোপচারের পর তার শারীরিক অবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রায়ই পায়ে ফোলা দেখা দেয়।

তবে বাবার সেবাকে কখনও বোঝা মনে করেন না সালিনাহ। সংসার চালানোর জন্য তিনি ঘরে তৈরি বিভিন্ন খাবার বিক্রি করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি প্রচারের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেন।

ভোর হওয়ার আগেই তার দিন শুরু হয়। বাবার খাবার তৈরি, পরিচর্যা এবং পুনর্বাসন ব্যায়ামের পাশাপাশি ব্যবসার কাজও সামলান তিনি।

ভালোবাসার ঋণ কখনও শোধ হয় না

অনেকেই মনে করেন, সালিনাহ বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য এসব করছেন। কিন্তু তিনি মনে করেন, বাবা-মায়ের ভালোবাসার ঋণ কোনোদিনই শোধ করা সম্ভব নয়।

তার ভাষায়, পৃথিবী হয়তো তাদের পালক বাবা-মা বলে পরিচয় দেয়, কিন্তু তার কাছে তারা ছিলেন প্রকৃত মা-বাবা। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তারা যে ভালোবাসা, ত্যাগ আর স্নেহ দিয়েছেন, তার তুলনায় নিজের সব চেষ্টা খুবই সামান্য।

সালিনাহ বিশ্বাস করেন, বাবা যখন তার প্রতিটি ইচ্ছা পূরণ করেছেন, তখন জীবনের এই সময়ে বাবাকে সুখে রাখা এবং তার পাশে থাকা একজন মেয়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

বাবার অসমান পায়ের সেই দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি আজও তাকে শক্তি দেয়। আর সেই শক্তিই তাকে প্রতিদিন নতুন করে বাবার সেবায় নিবেদিত থাকতে অনুপ্রাণিত করে।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

হাইলাইট: হাকিমপুরে সামান্য বৃষ্টিতেই বেহাল সড়ক, দুই গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ

বাবার অসমান পায়ের পথচলার ঋণ শোধে জীবন উৎসর্গ মেয়ের

০১:৩২:০১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়া থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত—সবকিছুই আজও স্পষ্ট মনে আছে সালিনাহ অ্যাডেলিনাহ আবদুল্লাহর। শৈশবে যে বাবা প্রতিদিন কষ্ট করে তাকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন, আজ সেই অসুস্থ বাবার সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন তিনি। বাবার প্রতি এক মেয়ের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের গল্প অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে।

স্বপ্ন ছেড়ে বাবার পাশে

সালিনাহর জীবনে ত্যাগের শুরু অনেক আগেই। একসময় তার স্বপ্ন ছিল বিমানবাহিনীতে যোগ দেওয়ার। কিন্তু পরিবারের দায়িত্বের কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। পরে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তার পালক মায়ের মৃত্যু হলে পরিস্থিতি আরও বদলে যায়।

এর কিছুদিন আগে স্ট্রোক ও স্নায়বিক জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তার ৭০ বছর বয়সী পালক বাবা আহমদ মোহাম্মদ তাহির। একাধিকবার খিঁচুনি এবং সংকটজনক অবস্থার কারণে তাকে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে কোমায় রাখা হয়েছিল।

To earn a living, Salinah Adelinah Abdullah   hosts live broadcasts on social media to sell homemade sambal, often with her father by her side.

সেই সময় চিকিৎসকেরা পরিবারের সদস্যদের ডেকে নেওয়ার পর সালিনাহ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—বাবা সুস্থ হয়ে ফিরলে তিনি চাকরি ছেড়ে তার দেখাশোনা করবেন। পরে বাবা সুস্থ হয়ে জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর তিনি নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন।

বৃষ্টিতে ভিজেও অপেক্ষা করতেন বাবা

সালিনাহ জানান, তার বাবার জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ছিল। একটি পা অন্যটির তুলনায় ছোট হওয়ায় হাঁটতে কষ্ট হতো। কিন্তু মেয়ের জন্য কোনো বাধাই তাকে থামাতে পারেনি।

মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকে প্রতিদিন মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন তিনি। স্কুলে নামিয়ে দিয়ে কাছের একটি ছোট্ট ছাউনিতে বসে অপেক্ষা করতেন। বৃষ্টির দিনে ছাউনির ফুটো দিয়ে পানি পড়ে জামাকাপড় ভিজে যেত, গরমের দিনে ঘামে ভিজে থাকতেন। তবুও কখনও অনুপস্থিত থাকতেন না।

স্কুল শেষে আবার মেয়ের হাত ধরে প্রায় সাত কিলোমিটার পথ হেঁটে বাড়ি ফিরতেন। বৃষ্টি এলে নিজের কাছে থাকা প্লাস্টিক দিয়ে মেয়ের মাথা ঢেকে দিতেন, কিন্তু নিজের কথা ভাবতেন না।

অভাবের সংসারে সন্তানের স্বপ্ন পূরণ

শৈশবের সবচেয়ে স্মরণীয় স্মৃতিগুলোর একটি হলো বাবার কিনে দেওয়া সাইকেল। আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও মেয়ের ইচ্ছা পূরণে কঠোর পরিশ্রম করতেন তিনি।

বরফ বিক্রি করে যে সামান্য আয় হতো, তার প্রায় পুরোটাই জমাতেন মেয়ের জন্য। সেই অর্থ দিয়ে কিনেছিলেন সাইকেল, দিয়েছিলেন শিক্ষাসফরসহ নানা প্রয়োজনের খরচ। নিজের জন্য তিনি প্রায় কিছুই ব্যয় করতেন না।

Stepping up for the father who walked her home [WATCH]

এখন মেয়েই বাবার ভরসা

বর্তমানে আহমদ মোহাম্মদ তাহির শয্যাশায়ী। পিত্তথলি এবং ক্ষতিগ্রস্ত অন্ত্রের একটি অংশ অপসারণের বড় অস্ত্রোপচারের পর তার শারীরিক অবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রায়ই পায়ে ফোলা দেখা দেয়।

তবে বাবার সেবাকে কখনও বোঝা মনে করেন না সালিনাহ। সংসার চালানোর জন্য তিনি ঘরে তৈরি বিভিন্ন খাবার বিক্রি করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি প্রচারের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেন।

ভোর হওয়ার আগেই তার দিন শুরু হয়। বাবার খাবার তৈরি, পরিচর্যা এবং পুনর্বাসন ব্যায়ামের পাশাপাশি ব্যবসার কাজও সামলান তিনি।

ভালোবাসার ঋণ কখনও শোধ হয় না

অনেকেই মনে করেন, সালিনাহ বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য এসব করছেন। কিন্তু তিনি মনে করেন, বাবা-মায়ের ভালোবাসার ঋণ কোনোদিনই শোধ করা সম্ভব নয়।

তার ভাষায়, পৃথিবী হয়তো তাদের পালক বাবা-মা বলে পরিচয় দেয়, কিন্তু তার কাছে তারা ছিলেন প্রকৃত মা-বাবা। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তারা যে ভালোবাসা, ত্যাগ আর স্নেহ দিয়েছেন, তার তুলনায় নিজের সব চেষ্টা খুবই সামান্য।

সালিনাহ বিশ্বাস করেন, বাবা যখন তার প্রতিটি ইচ্ছা পূরণ করেছেন, তখন জীবনের এই সময়ে বাবাকে সুখে রাখা এবং তার পাশে থাকা একজন মেয়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

বাবার অসমান পায়ের সেই দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি আজও তাকে শক্তি দেয়। আর সেই শক্তিই তাকে প্রতিদিন নতুন করে বাবার সেবায় নিবেদিত থাকতে অনুপ্রাণিত করে।