পাকিস্তানের বিখ্যাত আম মৌসুম এবারও জমে উঠেছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বাগানগুলোতে শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন পাকা আম সংগ্রহে। কিন্তু মাঠে ফলন থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে সেই আম পৌঁছানোর পথ আগের মতো সহজ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে দেশটির আম রফতানি বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, চলতি মৌসুমে পাকিস্তানের আম রফতানি অন্তত ৩০ শতাংশ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় রফতানিকারক ও বাগান মালিকরা বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
রফতানি বাজারে বড় ধাক্কা
পাকিস্তানের উৎপাদিত আমের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্তান ও আশপাশের বাজারে রফতানি করা হয়। তবে সাম্প্রতিক সংঘাত, সীমান্ত বাণিজ্যে বাধা এবং আঞ্চলিক অনিশ্চয়তার কারণে এসব বাজারে চাহিদা কমেছে।

রফতানিকারকদের মতে, গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রায় ৩০ হাজার টন কম আম বিদেশে পাঠানো হতে পারে। ফলে মোট রফতানি নেমে আসতে পারে প্রায় ৮০ হাজার টনে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাত কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এই মৌসুমের জন্য খুব একটা কাজে আসছে না। কারণ আমের মৌসুম সীমিত সময়ের এবং এর বড় অংশের বিপণন ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
পরিবহন খরচ কয়েক গুণ বৃদ্ধি
সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। আন্তর্জাতিক নৌপথে অস্থিরতার কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এর ফলে আম পরিবহনের খরচও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
একটি ২৫ টন ধারণক্ষমতার কনটেইনার বিদেশে পাঠাতে গত বছর যেখানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ ডলার খরচ হতো, সেখানে এখন সেই ব্যয় বেড়ে ৬ থেকে ৭ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। ফলে অনেক রফতানিকারক ব্যবসা চালিয়ে যাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাগান মালিকদের উদ্বেগ

সিন্ধুর আম উৎপাদন অঞ্চলে অনেক বাগান মালিক ও ইজারাদার এবার লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন। কেউ কেউ আগাম দেওয়া অর্থ ফেরত না নিয়েই চুক্তি বাতিল করেছেন।
তাদের অভিযোগ, উৎপাদন ব্যয়, শ্রমিক খরচ এবং জমির ইজারা মূল্য পরিশোধের পর যে আয় হওয়ার কথা ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পুরো মৌসুমটি অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটছে।
দেশীয় বাজারেও চাহিদা কম
রফতানি কমে যাওয়ায় দেশীয় বাজারে আমের সরবরাহ বেড়েছে। এর ফলে দামও কমেছে। অনেক এলাকায় আমের দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
তবে কম দামেও বিক্রি বাড়ছে না। কারণ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় খাদ্য ও দৈনন্দিন খরচ সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, মানুষ এখন ফলের চেয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে বাজারে ভালো মানের আম থাকলেও ক্রেতা তুলনামূলক কম।
অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা
পাকিস্তান বিশ্বের অন্যতম বড় আম রফতানিকারক দেশ। প্রতিবছর এই খাত থেকে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। কিন্তু চলমান সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি কতটা সহজে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের চাপের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক অস্থিরতাও এখন কৃষি ও রফতানি খাতের জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। আর তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হয়ে উঠেছে চলতি মৌসুমের আম বাণিজ্য।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















