মাত্র সাত বছরের মধ্যে চতুর্থবারের মতো ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ঘোষণার মঞ্চ তৈরি হলো। তবে এবারও কোনো সাধারণ নির্বাচনের ফল নয়, বরং নিজ দলের সংসদ সদস্যদের আস্থাহীনতাই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের বিদায়ের কারণ হয়ে দাঁড়াল।
সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে স্টারমার বলেন, তার দল এখন প্রশ্ন তুলছে তিনি পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টিকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি কি না। দলীয় সংসদীয় পার্টির দেওয়া উত্তরের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মাত্র কয়েক দিন আগেও তিনি নেতৃত্বের লড়াইয়ে টিকে থাকার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু সপ্তাহান্তে সরকারি অবকাশযাপন কেন্দ্র চেকার্সে স্ত্রী ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে আলোচনার পর তিনি উপলব্ধি করেন যে রাজনৈতিক বাস্তবতা আর তার পক্ষে নেই।
দল পুনর্গঠনের দাবি
বিদায়ী ভাষণে স্টারমার তার রাজনৈতিক অর্জনগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, লেবার পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণের সময় দলটি রাজনৈতিক, আর্থিক ও নৈতিকভাবে গভীর সংকটে ছিল। সমালোচকেরা বারবার বলেছিলেন দলটির আর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই, কিন্তু তিনি সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেছেন।
তার দাবি, নেতৃত্বে এসে তিনি দল থেকে ইহুদিবিদ্বেষের বিষাক্ত সংস্কৃতি দূর করেছেন এবং অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধার করেছেন।
সরকারের সাফল্যের দাবি
ক্ষমতায় থাকার সময়ের বিভিন্ন সাফল্যের কথাও উল্লেখ করেন স্টারমার। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে, মজুরি বেড়েছে, কৃচ্ছ্রসাধন নীতির অবসান ঘটেছে, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা কমেছে এবং সরকারের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে।
তবে তার বক্তব্যে সমালোচকদের উত্থাপিত ব্যর্থতাগুলোর কোনো উল্লেখ ছিল না। সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব, একের পর এক নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন, বারবার অগ্রাধিকার বদল এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে ঘন ঘন রদবদল নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেগুলো নিয়ে তিনি কিছু বলেননি।
জনসমর্থন হারানোর কারণ
স্টারমারের রাজনৈতিক পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে পর্যবেক্ষকেরা তার নেতৃত্বের ধরণ ও বার্তাকে দায়ী করছেন। নির্বাচনের আগে তিনি পরিবর্তন ও উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তিনি জনগণকে জানান যে দেশের অবস্থা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ এবং সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।
এই বার্তা ভোটারদের মধ্যে দ্রুত হতাশা তৈরি করে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর কয়েক মাসের মধ্যেই তার জনপ্রিয়তা তীব্রভাবে কমতে শুরু করে। নানা ধরনের পুনর্গঠন ও কৌশল পরিবর্তনের চেষ্টা হলেও জনমনে তার ভাবমূর্তি আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
উত্তরসূরি নিয়ে জোর আলোচনা
স্টারমারের ঘনিষ্ঠদের মতে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন তার বিরুদ্ধে কার্যত একটি অভ্যুত্থান ঘটেছে। বিশেষ করে লেবারের প্রভাবশালী নেতা অ্যান্ডি বার্নহামের ভূমিকা নিয়ে তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন।
পদত্যাগ ঘোষণার সময় তিনি নেতৃত্ব নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও ঘোষণা করেন এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের সমর্থন জোগাড়ের জন্য তিন সপ্তাহ সময় দেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনা খুব বেশি কার্যকর হয়নি। তার বক্তব্যের এক ঘণ্টার মধ্যেই সাবেক স্বাস্থ্যসচিব ওয়েস স্ট্রিটিং বার্নহামের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন। রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, নতুন নেতৃত্ব নিয়ে দলীয় সমঝোতা ইতোমধ্যে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
বার্নহাম এখন লেবারের পরবর্তী নেতা এবং ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। তবে তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে—যে পরিবর্তন ও আশার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার পূর্বসূরিরা ক্ষমতায় এসেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়ে ইতিহাসের প্রান্তে ঠাঁই নিয়েছেন। বার্নহাম সেই পরিণতি এড়াতে পারেন কি না, সেটিই এখন ব্রিটিশ রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ব্রিটেনে কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ, অ্যান্ডি বার্নহামের উত্থানের পথ প্রশস্ত
দলীয় বিদ্রোহের মুখে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার পদত্যাগ করেছেন। নেতৃত্ব সংকট, জনপ্রিয়তার পতন ও লেবার পার্টির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
স্টিভেন সুইনফোর্ড 


















