ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী চুক্তিকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলে উদ্বেগ বাড়ছে। দেশটির অনেক রাজনৈতিক নেতা, বিশ্লেষক ও সাধারণ নাগরিক মনে করছেন, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে নতুন প্রভাব ফেলতে পারে এবং দীর্ঘদিনের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কেও চাপ তৈরি করতে পারে।
সম্প্রতি জেরুজালেমে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী সম্মেলনে এই বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। সেখানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন বক্তা ও মার্কিন প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা দুই দেশের সম্পর্ককে দৃঢ় বলে উল্লেখ করলেও উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি।
সম্পর্ক নিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা
ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ মনে করছে, ইরানের সঙ্গে নতুন সমঝোতা দেশটির আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে লেবাননে সংঘাত এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসরায়েলের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রও সীমিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে কিছু প্রকাশ্য মতপার্থক্য ইসরায়েলিদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। অনেকের ধারণা, দুই দেশের ঐতিহ্যগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে কিছুটা হলেও টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।

মার্কিন মিত্রদের আশ্বাস
মার্কিন প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ইসরায়েলিদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন। তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক বহু দশকের এবং এটি সহজে দুর্বল হওয়ার নয়।
তাদের মতে, বর্তমান মতবিরোধকে কৌশলগত সম্পর্কের স্থায়ী পরিবর্তন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে কিছু বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান দেখা যেতে পারে।
তরুণ মার্কিনদের মনোভাবে পরিবর্তন
তবে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের জনমত। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, তরুণ মার্কিন ভোটারদের একটি বড় অংশ ইসরায়েল সম্পর্কে আগের তুলনায় বেশি সমালোচনামুখর হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, গাজা পরিস্থিতি এবং সামরিক অভিযানের মানবিক প্রভাব নিয়ে বিতর্কের কারণে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কিছুটা কমেছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে মার্কিন রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেক ক্ষেত্রেই জনমতের প্রতিফলন ঘটায়।

নেতানিয়াহুর অবস্থান
ইসরায়েলি সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, দেশটির প্রধানমন্ত্রী পরিস্থিতি নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন নন। তার বিশ্বাস, সাম্প্রতিক কিছু কঠোর মন্তব্য বা সমালোচনা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সরকারি পর্যায়ে এমনও ধারণা রয়েছে যে, দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা, সামরিক সহায়তা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা বর্তমানে নেই।
স্বনির্ভরতার আলোচনা
তবে এই পরিস্থিতি ইসরায়েলে নতুন একটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি মনে করছেন, ভবিষ্যতে যদি যুক্তরাষ্ট্রে কম সহানুভূতিশীল কোনো প্রশাসন ক্ষমতায় আসে, তাহলে ইসরায়েলকে আরও বেশি স্বনির্ভর হতে হবে।
সেই কারণে দেশটির সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত শক্তি এবং বিকল্প আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি চুক্তি বা রাজনৈতিক মতবিরোধের প্রশ্ন নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন আলোচনার সূচনা করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















