একসময় দেশের সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নাটক, সংগীত, আবৃত্তি, চারুকলা কিংবা অনানুষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক আড্ডা—সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসজুড়ে ছিল এক প্রাণবন্ত পরিবেশ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিচিত সাংস্কৃতিক আবহে পরিবর্তনের আভাস দেখছেন অনেক শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাবেক শিক্ষার্থীরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এখনো হচ্ছে, তবে আগের তুলনায় বড় পরিসরে নয়। অংশগ্রহণও কমেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় যে পরিবর্তন এসেছে, তার প্রভাব সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পড়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
সাংস্কৃতিক চর্চার পুরোনো আবহ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক পরিচয় শুধু আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। টিএসসি, চারুকলা ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন খোলা জায়গায় প্রতিদিনই চলত গান, আবৃত্তি, নাচের মহড়া ও সাংস্কৃতিক আলোচনা। এসব আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন তৈরি করত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক কর্মী রবিউল হোসেন বলেন, বিশেষ করে করোনা মহামারির আগ পর্যন্ত টিএসকেকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক চর্চা ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন দল ও সংগঠনের সদস্যরা সেখানে অনুশীলন করতেন এবং দর্শকরাও আগ্রহ নিয়ে অংশ নিতেন।

ভয়, অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক
রবিউল হোসেনের মতে, ৫ আগস্টের পর সাংস্কৃতিক পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, আওয়ামী লীগ বা বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার জায়গা বদলে এখন অনেকের মধ্যে ‘মব কালচার’ বা জনতার চাপের আশঙ্কা কাজ করছে। ফলে অনেকেই প্রকাশ্যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে দ্বিধা বোধ করছেন।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেকের অভিযোগ, জুলাই আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধকে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করানোর চেষ্টা হয়েছে, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এ কারণে কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিষয় নিয়ে কাজ করতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ডাকসুর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
দীর্ঘ বিরতির পর নির্বাচিত ডাকসু ফিরে আসার পর অনেক শিক্ষার্থী আশা করেছিলেন যে এটি ক্যাম্পাসে সাংস্কৃতিক পরিবেশ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু কিছু শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক কর্মীর অভিযোগ, ডাকসু সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তাদের দাবি, বর্তমান নেতৃত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের বদলে নির্দিষ্ট একটি ধারার কর্মকাণ্ডে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ ও সাবেক ডাকসু ভিপি প্রার্থী আবদুল কাদেরের অভিযোগ, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের জন্য নিরাপদ ও উৎসাহব্যঞ্জক পরিবেশ তৈরিতে বর্তমান ছাত্রনেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়কে সব শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্ব করতে হবে, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নয়।
কাওয়ালি ও মিলাদ মাহফিলের উত্থান
গত বছরের আগস্টের পর ক্যাম্পাসে কাওয়ালি অনুষ্ঠান ও মিলাদ মাহফিলের দৃশ্যমানতা বেড়েছে। কেউ কেউ এটিকে বাংলা সংস্কৃতির সমান্তরালে একটি বিকল্প সাংস্কৃতিক ধারা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক সংসদের সভাপতি আতীকুর রহমান তোহার মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ প্রবণতার গতি কমেছে এবং এটি প্রধান সাংস্কৃতিক ধারা হয়ে উঠতে পারেনি।
অন্যদিকে রবিউল হোসেন মনে করেন, মিলাদ মাহফিল বা ইসলামী সাংস্কৃতিক আয়োজন নতুন কিছু নয়। এগুলো আগে থেকেই ছিল, তবে তুলনামূলকভাবে সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠিত হতো। তাঁর মতে, এসব সাংস্কৃতিক চর্চাকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে বিতর্ক তৈরি হয়।

সাময়িক সংকট নাকি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন?
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। একপক্ষ মনে করে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কারণে সাময়িকভাবে কার্যক্রম কমে গিয়েছিল। অন্যপক্ষের মতে, সাংস্কৃতিক পরিসর এখনও সংকুচিত অবস্থায় রয়েছে।
তবে উভয় পক্ষই স্বীকার করছেন যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তা নির্ভর করবে ক্যাম্পাসে কতটা উন্মুক্ত, নিরাপদ ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ তৈরি করা যায় তার ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















