দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা আবারও হালনাগাদের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ২২ সদস্যের জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত এ পরিষদ নতুন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন এবং নিয়মিত হালনাগাদের দায়িত্ব পালন করবে।
রোববার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন পরিষদের অন্যতম দায়িত্ব হবে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রস্তুত করা এবং প্রতি দুই বছর অন্তর তা পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করা। এছাড়া বছরে অন্তত দুইবার বৈঠক আয়োজনের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগও থাকবে।
আগের তালিকা পর্যালোচনা করে নতুন উদ্যোগ

স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, পূর্বে প্রণীত তালিকাটি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন তালিকা তৈরি করা হবে। তাঁর মতে, অতীতের কিছু সিদ্ধান্তকে ঘিরে মামলা ও পাল্টা মামলার প্রেক্ষাপট থাকায় এবার সব ধরনের বিধিবিধান ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরিষদ গঠন করা হয়েছে।
তিনি জানান, অতীতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব এড়াতে ওষুধশিল্পের প্রতিনিধিদের টাস্কফোর্সে রাখা হয়নি। তবে এবার বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যদিও কাঁচামাল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বিএআইএমএ থেকে কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি।
২৯৫ ওষুধের সম্প্রসারিত তালিকা
চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ১১৭ থেকে বাড়িয়ে ২৯৫-এ উন্নীত করা হয়েছিল। এতে নতুন করে ১৭৮টি ওষুধ যুক্ত হয়। এর আগে ৮ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সম্প্রসারিত তালিকাটি অনুমোদন পেয়েছিল।
সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান সে সময় বলেছিলেন, তালিকাভুক্ত ২৯৫টি ওষুধ দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসা চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ রোগের চিকিৎসায়ও এসব ওষুধ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
দাম নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ নিশ্চিতে কঠোর শর্ত

সম্প্রসারিত তালিকার সঙ্গে প্রকাশিত নীতিমালায় ওষুধের মূল্য নির্ধারণে বিজ্ঞানভিত্তিক কাঠামো এবং বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করার বিভিন্ন বিধান যুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, প্রতিটি ওষুধ কোম্পানিকে তাদের বার্ষিক বিক্রয়ের অন্তত ২৫ শতাংশ পরিমাণ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করতে হবে। এ শর্ত পূরণ না করলে নতুন ওষুধের অনুমোদন স্থগিত থাকতে পারে।
এছাড়া নতুন জেনেরিক ওষুধের ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তুলনায় সর্বোচ্চ ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত খুচরা মূল্য বৃদ্ধি বা মার্ক-আপ নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছিল।
উচ্চ ওষুধ ব্যয়ের চাপ
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইকিউভিআই-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত ব্যয়ের প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ৪৪ টাকা ওষুধ কেনায় ব্যয় হয়। বৈশ্বিক গড় যেখানে ১৫ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের হার অনেক বেশি। ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, ওষুধের উচ্চমূল্যের কারণে প্রায় ৬১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেছেন, ওষুধের দাম এমনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন যাতে রোগী ও উৎপাদক—উভয় পক্ষই উপকৃত হয়। একই সঙ্গে কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য ওষুধ প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদে নতুন উদ্যোগ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















