০৩:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে রাজধানীতে সমাবেশের চেষ্টা নস্যাৎ: ডিএমপি কমিশনার নিউট্রিশনের ‘সুইট স্পট’: প্রোটিন ও ফাইবার একসঙ্গে মিলবে যে ৫ খাবারে নেতৃত্ব বদলালেই কি বদলাবে রাজনীতি? অ্যান্ডি বার্নহামের সামনে ব্রিটেনের নতুন পরীক্ষার মুহূর্ত চীনের সিদ্ধান্তেই কি নির্ধারিত হবে তেলের ভবিষ্যৎ দাম? বাংলাদেশ চীন থেকে ২৪টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কিনছে, চূড়ান্ত চুক্তির পথে ঢাকা-বেইজিং কোটাক মহিন্দ্রার বড় লক্ষ্য: অধিগ্রহণ ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে ভারতের শীর্ষ তিন বেসরকারি ব্যাংকের কাতারে উঠতে চায় রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণের চাপ, অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় বাড়ছে ঝুঁকি ভারতে এলপিজির ব্যবহার কমেছে ২০ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি ছুঁতে যাচ্ছে রেকর্ড উচ্চতা ইরান শান্তি আলোচনায় পাকিস্তানের ভূমিকা: কূটনৈতিক সাফল্য কি অর্থনৈতিক লাভে রূপ নেবে? ইংল্যান্ডের নতুন ফুটবল দর্শন: কেন কেবল অভিজ্ঞতা আর যথেষ্ট নয়

তৈরি পোশাক শিল্পের সংকট সাময়িক, নাকি সামনে আরও কঠিন সময়?

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যে শিল্প দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি যোগান দেয়, প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে অর্থনীতিকে সচল রাখে, সেই শিল্পই এখন বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর মূল্য কমানোর চাপ, দেশের ভেতরে তীব্র জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়া—সব মিলিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় শিল্পখাতটির সামনে নতুন এক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

শিল্প মালিকরা বলছেন, করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা বৈশ্বিক মন্দার ধাক্কা মোকাবিলা করে বাংলাদেশ এর আগেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এবারের সংকটের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। কারণ, এটি শুধু বৈশ্বিক মন্দার সংকট নয়; বরং দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাও এখন প্রকট হয়ে উঠেছে। ফলে অনেকের কাছেই প্রশ্ন, এই সংকট কি সাময়িক, নাকি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার পরীক্ষার মুখোমুখি?

কতটা গভীর হয়েছে সংকট?

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কমে ৩৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অর্থবছরের অধিকাংশ মাসেই প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক। ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি আয় কমেছে ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ। টানা কয়েক মাস ধরে রপ্তানিতে পতন অব্যাহত থাকায় শিল্পমালিকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোতে হঠাৎ দুদকের অভিযান | প্রথম আলো

তবে উদ্বেগের জায়গা শুধু রপ্তানি আয় কমা নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের গড় মূল্যও কমে গেছে। ইউরোপের বাজারে গড় ইউনিট মূল্য প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ উদ্যোক্তারা আগের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে রপ্তানি আয় কমার পাশাপাশি মুনাফাও কমে যাচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট। শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের স্বল্পচাপ ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

সংকটের পেছনের কারণ কী?

বিশ্লেষকরা বলছেন, সংকটের পেছনে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ, দুই ধরনের কারণ কাজ করছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ভোক্তারা ব্যয় কমিয়ে দিয়েছেন। পোশাক খাতে খুচরা বিক্রি প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়ায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতারা নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

একই সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্রেতা ছোট ছোট অর্ডার দিচ্ছেন এবং আগের চেয়ে কম দামে পণ্য কিনতে চাইছেন।

কিন্তু শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতি দিয়ে সংকট ব্যাখ্যা করা যাবে না। দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার, ডলারের বিনিময় হার নিয়ে অস্থিরতা, বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার ধীরগতি এবং কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিয়েছে।

গার্মেন্টস: তৈরি পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকদের হার কমে যাওয়ার কারণ কী? - BBC  News বাংলা

হারাচ্ছে ইউরোপের বাজার

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কিন্তু এই বাজারেই এখন সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে।

চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ১৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ইউরোপের মোট পোশাক আমদানি কমেছে ১০ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ বাজার ছোট হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের পতন হয়েছে তার দ্বিগুণ হারে।

ফলে এক বছরে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব প্রায় আড়াই শতাংশ পয়েন্ট কমে গেছে। প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাজার হারিয়েছে বাংলাদেশ। এটি নিছক বৈশ্বিক মন্দার প্রভাব নয়; বরং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ারও একটি বড় সতর্কসংকেত।

প্রতিযোগীরা যখন এগিয়ে যাচ্ছে

বাংলাদেশ যখন জ্বালানি সংকট ও ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে লড়ছে, তখন ভিয়েতনাম, ভারত ও চীন নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে।

ভিয়েতনাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা পাচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, উচ্চমূল্যের পণ্য এবং দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে দেশটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।

চীনও বাজার ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ভারত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থান বজায় রেখেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘ লিড টাইম এবং জ্বালানি সংকট আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করছে।

LDC graduation: Bangladesh gets 3-year extension till 2029

ঝুঁকিতে কর্মসংস্থান

দেশের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তাদের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী। ফলে দীর্ঘমেয়াদি মন্দা দেখা দিলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানে।

এখনও বড় আকারে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু না হলেও নতুন নিয়োগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। অর্ডার কমে গেলে কারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হবে। এতে কর্মঘণ্টা কমে যাওয়া, ওভারটাইম কমে যাওয়া এবং ধীরে ধীরে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, পোশাক খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকট শুধু একটি শিল্পের সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও হুমকি।

আশার আলো কি একেবারে নিভে গেছে?

সব প্রতিকূলতার মধ্যেও আশার জায়গা রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব কারখানার একটি বড় অংশ বাংলাদেশে অবস্থিত। টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা এখনও শক্তিশালী।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের ফলে নতুন সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের সুযোগ রয়েছে।

মে মাসে ইউরোপের বাজারে কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষণও দেখা গেছে। যদিও এটিকে পূর্ণাঙ্গ ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সময় এখনও আসেনি, তবুও এটি কিছুটা আশাবাদের জন্ম দিয়েছে।

সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ : এলডিসি উত্তরণ’

চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস হাউস পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন অনিশ্চিত

২০২৯ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে বর্তমানে পাওয়া শুল্কমুক্ত সুবিধা আর থাকবে না। ফলে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে।

যদি জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে রপ্তানিকারকদের বাড়তি শুল্কের মুখোমুখি হতে হবে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা ভোগ করছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কতটা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে শিল্পকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে।

বিশ্ববাজারে এখন স্পোর্টসওয়্যার, ফাংশনাল পোশাক, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, মেডিকেল টেক্সটাইল এবং উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশ যদি সাধারণ পোশাকের বাইরে এসব পণ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে, তাহলে মূল্য সংযোজন এবং আয়, দুটিই বাড়বে।

একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা সম্ভব।

সরকারকে যা করতে হবে

শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। উৎপাদন ব্যয় কমাতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে।

বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে। লিড টাইম কমাতে হবে। সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। এলডিসি উত্তরণের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে সরকারি সহায়তা বাড়াতে হবে।

ব্যবসায়ীদেরও বদলাতে হবে কৌশল

বিজিএমইএ'র নতুন পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব গ্রহণ | বাণিজ্য | বাংলাদেশ সংবাদ  সংস্থা (বাসস)

সব দায় সরকারের নয়। উদ্যোক্তাদেরও পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। কম দামের সাধারণ পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উচ্চমূল্যের এবং মূল্যসংযোজনকারী পণ্যের দিকে যেতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, অটোমেশন এবং গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

নতুন বাজার খুঁজে বের করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও মধ্য এশিয়ার বাজারে আরও জোরালোভাবে প্রবেশের উদ্যোগ নিতে হবে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বৈশ্বিক বাজার এখনও পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি। ইউরোপ ও আমেরিকার ভোক্তারা এখনও ব্যয় সংকোচনের মধ্যে রয়েছেন। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আগের চেয়ে বেশি সতর্ক হয়ে অর্ডার দিচ্ছেন এবং দাম কমানোর চাপও বাড়াচ্ছেন।

তার মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা। উৎপাদন ব্যয় কমানো, বন্দর ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো এবং উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে ঝুঁকতে না পারলে হারানো বাজার পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে।

শেষ কথা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে নিঃসন্দেহে একটি কঠিন সময় পার করছে। তবে এটিই প্রথম সংকট নয়। অতীতেও এই শিল্প বড় বড় ধাক্কা মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু এবারের সংকট শুধু অর্ডার কমে যাওয়ার সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, নীতিগত প্রস্তুতি এবং শিল্প ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতারও পরীক্ষা।

বিশ্ববাজারে চাহিদা একসময় ফিরে আসবে। কিন্তু সেই বাজারে বাংলাদেশের হারানো অবস্থান ফিরে পাওয়া যাবে কিনা, তা নির্ভর করবে আজকের সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতির ওপর।

কারণ বিশ্ববাজারে জায়গা কখনো খালি থাকে না। কেউ সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে অন্য কেউ সেই জায়গা দখল করে নেয়। তাই এখন আত্মতুষ্টির সময় নয়; সময় দ্রুত সংস্কার, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার।

তৈরি পোশাক শিল্পকে শক্তিশালী রাখা মানে শুধু একটি শিল্পকে বাঁচানো নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং উন্নয়নের ভিত্তিকে সুরক্ষিত রাখা। কারণ দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভকে শক্তিশালী রাখতে না পারলে তার প্রভাব শুধু একটি শিল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো অর্থনীতিকেই বহন করতে হবে তার ভার।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে রাজধানীতে সমাবেশের চেষ্টা নস্যাৎ: ডিএমপি কমিশনার

তৈরি পোশাক শিল্পের সংকট সাময়িক, নাকি সামনে আরও কঠিন সময়?

০২:২৯:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্প এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যে শিল্প দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি যোগান দেয়, প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে অর্থনীতিকে সচল রাখে, সেই শিল্পই এখন বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর মূল্য কমানোর চাপ, দেশের ভেতরে তীব্র জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়া—সব মিলিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় শিল্পখাতটির সামনে নতুন এক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

শিল্প মালিকরা বলছেন, করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা বৈশ্বিক মন্দার ধাক্কা মোকাবিলা করে বাংলাদেশ এর আগেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এবারের সংকটের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। কারণ, এটি শুধু বৈশ্বিক মন্দার সংকট নয়; বরং দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাও এখন প্রকট হয়ে উঠেছে। ফলে অনেকের কাছেই প্রশ্ন, এই সংকট কি সাময়িক, নাকি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার পরীক্ষার মুখোমুখি?

কতটা গভীর হয়েছে সংকট?

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কমে ৩৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অর্থবছরের অধিকাংশ মাসেই প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক। ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি আয় কমেছে ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ। টানা কয়েক মাস ধরে রপ্তানিতে পতন অব্যাহত থাকায় শিল্পমালিকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোতে হঠাৎ দুদকের অভিযান | প্রথম আলো

তবে উদ্বেগের জায়গা শুধু রপ্তানি আয় কমা নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের গড় মূল্যও কমে গেছে। ইউরোপের বাজারে গড় ইউনিট মূল্য প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ উদ্যোক্তারা আগের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে রপ্তানি আয় কমার পাশাপাশি মুনাফাও কমে যাচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট। শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের স্বল্পচাপ ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

সংকটের পেছনের কারণ কী?

বিশ্লেষকরা বলছেন, সংকটের পেছনে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ, দুই ধরনের কারণ কাজ করছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ভোক্তারা ব্যয় কমিয়ে দিয়েছেন। পোশাক খাতে খুচরা বিক্রি প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়ায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতারা নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

একই সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্রেতা ছোট ছোট অর্ডার দিচ্ছেন এবং আগের চেয়ে কম দামে পণ্য কিনতে চাইছেন।

কিন্তু শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতি দিয়ে সংকট ব্যাখ্যা করা যাবে না। দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার, ডলারের বিনিময় হার নিয়ে অস্থিরতা, বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার ধীরগতি এবং কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিয়েছে।

গার্মেন্টস: তৈরি পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকদের হার কমে যাওয়ার কারণ কী? - BBC  News বাংলা

হারাচ্ছে ইউরোপের বাজার

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কিন্তু এই বাজারেই এখন সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে।

চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ১৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ইউরোপের মোট পোশাক আমদানি কমেছে ১০ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ বাজার ছোট হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের পতন হয়েছে তার দ্বিগুণ হারে।

ফলে এক বছরে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব প্রায় আড়াই শতাংশ পয়েন্ট কমে গেছে। প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাজার হারিয়েছে বাংলাদেশ। এটি নিছক বৈশ্বিক মন্দার প্রভাব নয়; বরং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ারও একটি বড় সতর্কসংকেত।

প্রতিযোগীরা যখন এগিয়ে যাচ্ছে

বাংলাদেশ যখন জ্বালানি সংকট ও ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে লড়ছে, তখন ভিয়েতনাম, ভারত ও চীন নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে।

ভিয়েতনাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা পাচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, উচ্চমূল্যের পণ্য এবং দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে দেশটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।

চীনও বাজার ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ভারত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থান বজায় রেখেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘ লিড টাইম এবং জ্বালানি সংকট আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করছে।

LDC graduation: Bangladesh gets 3-year extension till 2029

ঝুঁকিতে কর্মসংস্থান

দেশের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তাদের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী। ফলে দীর্ঘমেয়াদি মন্দা দেখা দিলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানে।

এখনও বড় আকারে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু না হলেও নতুন নিয়োগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। অর্ডার কমে গেলে কারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হবে। এতে কর্মঘণ্টা কমে যাওয়া, ওভারটাইম কমে যাওয়া এবং ধীরে ধীরে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, পোশাক খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকট শুধু একটি শিল্পের সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও হুমকি।

আশার আলো কি একেবারে নিভে গেছে?

সব প্রতিকূলতার মধ্যেও আশার জায়গা রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব কারখানার একটি বড় অংশ বাংলাদেশে অবস্থিত। টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা এখনও শক্তিশালী।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের ফলে নতুন সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের সুযোগ রয়েছে।

মে মাসে ইউরোপের বাজারে কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষণও দেখা গেছে। যদিও এটিকে পূর্ণাঙ্গ ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সময় এখনও আসেনি, তবুও এটি কিছুটা আশাবাদের জন্ম দিয়েছে।

সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ : এলডিসি উত্তরণ’

চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস হাউস পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন অনিশ্চিত

২০২৯ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে বর্তমানে পাওয়া শুল্কমুক্ত সুবিধা আর থাকবে না। ফলে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে।

যদি জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে রপ্তানিকারকদের বাড়তি শুল্কের মুখোমুখি হতে হবে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা ভোগ করছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কতটা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে শিল্পকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে।

বিশ্ববাজারে এখন স্পোর্টসওয়্যার, ফাংশনাল পোশাক, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, মেডিকেল টেক্সটাইল এবং উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশ যদি সাধারণ পোশাকের বাইরে এসব পণ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে, তাহলে মূল্য সংযোজন এবং আয়, দুটিই বাড়বে।

একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা সম্ভব।

সরকারকে যা করতে হবে

শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। উৎপাদন ব্যয় কমাতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে।

বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে। লিড টাইম কমাতে হবে। সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। এলডিসি উত্তরণের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে সরকারি সহায়তা বাড়াতে হবে।

ব্যবসায়ীদেরও বদলাতে হবে কৌশল

বিজিএমইএ'র নতুন পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব গ্রহণ | বাণিজ্য | বাংলাদেশ সংবাদ  সংস্থা (বাসস)

সব দায় সরকারের নয়। উদ্যোক্তাদেরও পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। কম দামের সাধারণ পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উচ্চমূল্যের এবং মূল্যসংযোজনকারী পণ্যের দিকে যেতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, অটোমেশন এবং গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

নতুন বাজার খুঁজে বের করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও মধ্য এশিয়ার বাজারে আরও জোরালোভাবে প্রবেশের উদ্যোগ নিতে হবে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বৈশ্বিক বাজার এখনও পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি। ইউরোপ ও আমেরিকার ভোক্তারা এখনও ব্যয় সংকোচনের মধ্যে রয়েছেন। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আগের চেয়ে বেশি সতর্ক হয়ে অর্ডার দিচ্ছেন এবং দাম কমানোর চাপও বাড়াচ্ছেন।

তার মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা। উৎপাদন ব্যয় কমানো, বন্দর ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো এবং উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে ঝুঁকতে না পারলে হারানো বাজার পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে।

শেষ কথা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে নিঃসন্দেহে একটি কঠিন সময় পার করছে। তবে এটিই প্রথম সংকট নয়। অতীতেও এই শিল্প বড় বড় ধাক্কা মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু এবারের সংকট শুধু অর্ডার কমে যাওয়ার সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, নীতিগত প্রস্তুতি এবং শিল্প ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতারও পরীক্ষা।

বিশ্ববাজারে চাহিদা একসময় ফিরে আসবে। কিন্তু সেই বাজারে বাংলাদেশের হারানো অবস্থান ফিরে পাওয়া যাবে কিনা, তা নির্ভর করবে আজকের সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতির ওপর।

কারণ বিশ্ববাজারে জায়গা কখনো খালি থাকে না। কেউ সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে অন্য কেউ সেই জায়গা দখল করে নেয়। তাই এখন আত্মতুষ্টির সময় নয়; সময় দ্রুত সংস্কার, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার।

তৈরি পোশাক শিল্পকে শক্তিশালী রাখা মানে শুধু একটি শিল্পকে বাঁচানো নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং উন্নয়নের ভিত্তিকে সুরক্ষিত রাখা। কারণ দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভকে শক্তিশালী রাখতে না পারলে তার প্রভাব শুধু একটি শিল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো অর্থনীতিকেই বহন করতে হবে তার ভার।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক