০৩:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে রাজধানীতে সমাবেশের চেষ্টা নস্যাৎ: ডিএমপি কমিশনার নিউট্রিশনের ‘সুইট স্পট’: প্রোটিন ও ফাইবার একসঙ্গে মিলবে যে ৫ খাবারে নেতৃত্ব বদলালেই কি বদলাবে রাজনীতি? অ্যান্ডি বার্নহামের সামনে ব্রিটেনের নতুন পরীক্ষার মুহূর্ত চীনের সিদ্ধান্তেই কি নির্ধারিত হবে তেলের ভবিষ্যৎ দাম? বাংলাদেশ চীন থেকে ২৪টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কিনছে, চূড়ান্ত চুক্তির পথে ঢাকা-বেইজিং কোটাক মহিন্দ্রার বড় লক্ষ্য: অধিগ্রহণ ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে ভারতের শীর্ষ তিন বেসরকারি ব্যাংকের কাতারে উঠতে চায় রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণের চাপ, অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় বাড়ছে ঝুঁকি ভারতে এলপিজির ব্যবহার কমেছে ২০ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি ছুঁতে যাচ্ছে রেকর্ড উচ্চতা ইরান শান্তি আলোচনায় পাকিস্তানের ভূমিকা: কূটনৈতিক সাফল্য কি অর্থনৈতিক লাভে রূপ নেবে? ইংল্যান্ডের নতুন ফুটবল দর্শন: কেন কেবল অভিজ্ঞতা আর যথেষ্ট নয়

নিষিদ্ধ কণ্ঠের মূল্য: গান গাওয়ায় ৭৪ বেত্রাঘাতের সাজা, ইরানে নারীদের প্রতি নতুন বার্তা

ইরানের জনপ্রিয় গায়িকা পারাস্তু আহমাদির একটি কনসার্টকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় এসেছে দেশটির নারীর অধিকার, শিল্পী স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। কয়েক মাস আগে প্রকাশিত একটি ভিডিও কনসার্টের জন্য আহমাদি ও তার দলের আট সদস্যকে ৭৪ বেত্রাঘাত, দুই বছরের বিদেশ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং দুই বছরের শিল্পচর্চা নিষেধাজ্ঞার সাজা দেওয়া হয়েছে বলে তার আইনজীবী দলের একজন সদস্য নিশ্চিত করেছেন।

প্রাচীন দেইর গাচিন কারাভানসারাইয়ে ধারণ করা ওই কনসার্টে আহমাদি একক কণ্ঠে গান পরিবেশন করেছিলেন। ভিডিওটি প্রকাশের পর থেকে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ এটি দেখেছেন। কিন্তু দর্শকদের পাশাপাশি নজর ছিল ইরানি কর্তৃপক্ষেরও।

শিল্পীসত্তার প্রকাশ থেকে আদালতের কাঠগড়ায়

আহমাদি নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেন “প্রিয় মানুষের জন্য গান গাইতে চাওয়া এক মেয়ে” হিসেবে। কনসার্টের ভিডিওর বর্ণনায় তিনি লিখেছিলেন, নিজের ভালোবাসার দেশের জন্য গান গাওয়া এমন একটি অধিকার, যা তিনি উপেক্ষা করতে পারেন না।

ইরানের কোম প্রদেশের ফৌজদারি আদালত অভিযোগ করেছে, অনলাইনে “অশ্লীল ও অনৈতিক” কনটেন্ট তৈরি ও প্রকাশের মাধ্যমে তারা জনশালীনতা লঙ্ঘন করেছেন। আদালতের রায়ের আওতায় কেবল আহমাদি নন, ভিডিও নির্মাণ ও প্রকাশে যুক্ত আরও আটজনও শাস্তির মুখে পড়েছেন।

74 Lashes For A Song: Iranian Artist Sentenced For Virtual Concert

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানে নারী শিল্পীরা প্রকাশ্যে একক গান পরিবেশন করতে পারতেন। কিন্তু বিপ্লবের পর দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্ব একক নারী কণ্ঠে প্রকাশ্য সংগীত পরিবেশনকে শরিয়াহবিরোধী ঘোষণা করে। বর্তমানে নারীরা কেবল দলীয় পরিবেশনার অংশ হিসেবে বা শুধুমাত্র নারী শ্রোতাদের সামনে এককভাবে গান গাইতে পারেন।

নারী নিয়ন্ত্রণই রাষ্ট্রের বার্তা?

নারী অধিকারকর্মীদের মতে, এই রায় কেবল একটি কনসার্টকে ঘিরে নয়; এটি নারীদের জন্য একটি রাজনৈতিক বার্তা। যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত ইরানি নারীবাদী কর্মী সামানে সাভাদি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা বা সমঝোতার পথে হাঁটলেও নারীদের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে ইরানি রাষ্ট্র আপস করতে প্রস্তুত নয়।

তার ভাষায়, নারীদের নিয়ন্ত্রণ করা বর্তমান ব্যবস্থার পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। একজন নারী যখন স্বাধীন মানুষের মতো আচরণ করেন, তখন সেটিই রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলে।

একটি শব্দের সংজ্ঞা নিয়েও বিতর্ক

এই মামলার অন্যতম আসামি ও প্রামাণ্যচিত্র আলোকচিত্রী তাহমিনেহ মনজাভি আদালত কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, শুনানির একপর্যায়ে “অশ্লীলতা” শব্দের অর্থ নিয়ে এমন বিতর্ক শুরু হয় যে আইনজীবী বিচারকের সামনে ফারসি ভাষার বিখ্যাত অভিধান থেকে শব্দটির সংজ্ঞা পড়ে শোনান।

Iranian artist Parastoo Ahmadi reportedly sentenced to 74 lashes for singing  without hijab | Euronews

মনজাভির মতে, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল একই সঙ্গে সরল, জটিল এবং অর্থহীন। শেষ পর্যন্ত সেই কনসার্টের স্মৃতি তাদের জন্য দুই বছরের শিল্পনিষেধাজ্ঞা, দুই বছরের দেশত্যাগ নিষেধাজ্ঞা এবং ৭৪ বেত্রাঘাতের সাজা বয়ে এনেছে।

বেত্রাঘাত শুধু শারীরিক শাস্তি নয়

তেহরানের এক নারী অধিকারকর্মী ও সাবেক রাজনৈতিক বন্দির মতে, বেত্রাঘাতের উদ্দেশ্য কেবল শরীরে আঘাত করা নয়; এর মাধ্যমে ভয় সৃষ্টি এবং অপমানবোধ চাপিয়ে দেওয়া হয়। তার ভাষায়, এটি এমন একটি বার্তা যে রাষ্ট্র যখন খুশি মানুষের শরীরের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

আরেক শিল্পী ও অধিকারকর্মী আতাশ শাহকারামি, যিনি নিজেও বেত্রাঘাতের শাস্তি ভোগ করেছেন, বলেন এমন শাস্তি মানুষের মনোবল ভাঙার জন্য দেওয়া হয়। তবে তার বিশ্বাস, শারীরিক ও মানসিক অপমানের এই অভিজ্ঞতা অনেক নারীকে আরও দৃঢ় করে তোলে।

প্রতিবাদের কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়ছে

পথশিল্পী জারা এসমাইলিও আহমাদির ঘটনার সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পান। হিজাব ছাড়া রাস্তায় গান গাওয়ার একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তাকে গ্রেপ্তার, কারাবন্দি এবং ইলেকট্রনিক নজরদারির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। পরে তাকে স্থগিত বেত্রাঘাতের সাজা দেওয়া হয়।

তবে তিনি বলেন, আহমাদির গান দেখে তার মনে হয়েছিল তারা সবাই একই প্রতিরোধের অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তেহরানের রাস্তায় নিজেদের ছবি ছড়িয়ে পড়তে দেখে তিনি উপলব্ধি করেন, একা নন—একই দাবিতে আরও অনেক কণ্ঠ উচ্চারিত হচ্ছে।

পারাস্তু আহমাদির সাজা তাই শুধু একজন শিল্পীর বিরুদ্ধে দেওয়া রায় নয়; এটি ইরানে শিল্প, নারী স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের চলমান সংঘাতের নতুন অধ্যায় হয়ে উঠেছে।

74 Lashes For A Song: Iranian Artist Sentenced For Virtual Concert

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে রাজধানীতে সমাবেশের চেষ্টা নস্যাৎ: ডিএমপি কমিশনার

নিষিদ্ধ কণ্ঠের মূল্য: গান গাওয়ায় ৭৪ বেত্রাঘাতের সাজা, ইরানে নারীদের প্রতি নতুন বার্তা

০২:৩৬:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

ইরানের জনপ্রিয় গায়িকা পারাস্তু আহমাদির একটি কনসার্টকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় এসেছে দেশটির নারীর অধিকার, শিল্পী স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। কয়েক মাস আগে প্রকাশিত একটি ভিডিও কনসার্টের জন্য আহমাদি ও তার দলের আট সদস্যকে ৭৪ বেত্রাঘাত, দুই বছরের বিদেশ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং দুই বছরের শিল্পচর্চা নিষেধাজ্ঞার সাজা দেওয়া হয়েছে বলে তার আইনজীবী দলের একজন সদস্য নিশ্চিত করেছেন।

প্রাচীন দেইর গাচিন কারাভানসারাইয়ে ধারণ করা ওই কনসার্টে আহমাদি একক কণ্ঠে গান পরিবেশন করেছিলেন। ভিডিওটি প্রকাশের পর থেকে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ এটি দেখেছেন। কিন্তু দর্শকদের পাশাপাশি নজর ছিল ইরানি কর্তৃপক্ষেরও।

শিল্পীসত্তার প্রকাশ থেকে আদালতের কাঠগড়ায়

আহমাদি নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেন “প্রিয় মানুষের জন্য গান গাইতে চাওয়া এক মেয়ে” হিসেবে। কনসার্টের ভিডিওর বর্ণনায় তিনি লিখেছিলেন, নিজের ভালোবাসার দেশের জন্য গান গাওয়া এমন একটি অধিকার, যা তিনি উপেক্ষা করতে পারেন না।

ইরানের কোম প্রদেশের ফৌজদারি আদালত অভিযোগ করেছে, অনলাইনে “অশ্লীল ও অনৈতিক” কনটেন্ট তৈরি ও প্রকাশের মাধ্যমে তারা জনশালীনতা লঙ্ঘন করেছেন। আদালতের রায়ের আওতায় কেবল আহমাদি নন, ভিডিও নির্মাণ ও প্রকাশে যুক্ত আরও আটজনও শাস্তির মুখে পড়েছেন।

74 Lashes For A Song: Iranian Artist Sentenced For Virtual Concert

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানে নারী শিল্পীরা প্রকাশ্যে একক গান পরিবেশন করতে পারতেন। কিন্তু বিপ্লবের পর দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্ব একক নারী কণ্ঠে প্রকাশ্য সংগীত পরিবেশনকে শরিয়াহবিরোধী ঘোষণা করে। বর্তমানে নারীরা কেবল দলীয় পরিবেশনার অংশ হিসেবে বা শুধুমাত্র নারী শ্রোতাদের সামনে এককভাবে গান গাইতে পারেন।

নারী নিয়ন্ত্রণই রাষ্ট্রের বার্তা?

নারী অধিকারকর্মীদের মতে, এই রায় কেবল একটি কনসার্টকে ঘিরে নয়; এটি নারীদের জন্য একটি রাজনৈতিক বার্তা। যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত ইরানি নারীবাদী কর্মী সামানে সাভাদি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা বা সমঝোতার পথে হাঁটলেও নারীদের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে ইরানি রাষ্ট্র আপস করতে প্রস্তুত নয়।

তার ভাষায়, নারীদের নিয়ন্ত্রণ করা বর্তমান ব্যবস্থার পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। একজন নারী যখন স্বাধীন মানুষের মতো আচরণ করেন, তখন সেটিই রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলে।

একটি শব্দের সংজ্ঞা নিয়েও বিতর্ক

এই মামলার অন্যতম আসামি ও প্রামাণ্যচিত্র আলোকচিত্রী তাহমিনেহ মনজাভি আদালত কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, শুনানির একপর্যায়ে “অশ্লীলতা” শব্দের অর্থ নিয়ে এমন বিতর্ক শুরু হয় যে আইনজীবী বিচারকের সামনে ফারসি ভাষার বিখ্যাত অভিধান থেকে শব্দটির সংজ্ঞা পড়ে শোনান।

Iranian artist Parastoo Ahmadi reportedly sentenced to 74 lashes for singing  without hijab | Euronews

মনজাভির মতে, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল একই সঙ্গে সরল, জটিল এবং অর্থহীন। শেষ পর্যন্ত সেই কনসার্টের স্মৃতি তাদের জন্য দুই বছরের শিল্পনিষেধাজ্ঞা, দুই বছরের দেশত্যাগ নিষেধাজ্ঞা এবং ৭৪ বেত্রাঘাতের সাজা বয়ে এনেছে।

বেত্রাঘাত শুধু শারীরিক শাস্তি নয়

তেহরানের এক নারী অধিকারকর্মী ও সাবেক রাজনৈতিক বন্দির মতে, বেত্রাঘাতের উদ্দেশ্য কেবল শরীরে আঘাত করা নয়; এর মাধ্যমে ভয় সৃষ্টি এবং অপমানবোধ চাপিয়ে দেওয়া হয়। তার ভাষায়, এটি এমন একটি বার্তা যে রাষ্ট্র যখন খুশি মানুষের শরীরের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

আরেক শিল্পী ও অধিকারকর্মী আতাশ শাহকারামি, যিনি নিজেও বেত্রাঘাতের শাস্তি ভোগ করেছেন, বলেন এমন শাস্তি মানুষের মনোবল ভাঙার জন্য দেওয়া হয়। তবে তার বিশ্বাস, শারীরিক ও মানসিক অপমানের এই অভিজ্ঞতা অনেক নারীকে আরও দৃঢ় করে তোলে।

প্রতিবাদের কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়ছে

পথশিল্পী জারা এসমাইলিও আহমাদির ঘটনার সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পান। হিজাব ছাড়া রাস্তায় গান গাওয়ার একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তাকে গ্রেপ্তার, কারাবন্দি এবং ইলেকট্রনিক নজরদারির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। পরে তাকে স্থগিত বেত্রাঘাতের সাজা দেওয়া হয়।

তবে তিনি বলেন, আহমাদির গান দেখে তার মনে হয়েছিল তারা সবাই একই প্রতিরোধের অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তেহরানের রাস্তায় নিজেদের ছবি ছড়িয়ে পড়তে দেখে তিনি উপলব্ধি করেন, একা নন—একই দাবিতে আরও অনেক কণ্ঠ উচ্চারিত হচ্ছে।

পারাস্তু আহমাদির সাজা তাই শুধু একজন শিল্পীর বিরুদ্ধে দেওয়া রায় নয়; এটি ইরানে শিল্প, নারী স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের চলমান সংঘাতের নতুন অধ্যায় হয়ে উঠেছে।

74 Lashes For A Song: Iranian Artist Sentenced For Virtual Concert